নাম ও বংশ পরিচিতি
মূল নাম, আব্দুল ওয়াহিদ। উপনাম, আবু উবাইদা। পিতার নাম যাইদ। তিনি ছিলেন ইরাকের বসরা শহরের অধিবাসী।
জন্ম ও প্রতিপালন
তার জন্ম সম্পর্কে ইতিহাসের কিতাবগুলোতে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় নি।
শিক্ষা ও দীক্ষা
তদানিন্তনকালে ইরাকের দুটি বিখ্যাত শহর কুফা ও বসরা ইলমের অধ্যয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রভুত প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। বসরার সেই জ্ঞান—গবেষণার আলো—বাতাসে চক্ষু উন্মিলনের দরুন অনেক বিখ্যাত আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তির সাহচর্যে থেকে জ্ঞানার্জনের সুযোগ তিনি লাভ করেন। তাঁর শিক্ষকমণ্ডলীদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন, ইমাম আজম আবু হানিফা রহ., হযরত হাসান বসরি রহ., হযরত আতা ইবনু আবি রাবাহ রহ., হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু রাশেদ রহ. হযরত উবাদা ইবনু নুসাই রহ. প্রমুখ। শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ.এর মতে, তিনি হযরত আলি রা.এর ছাত্রত্ব অর্জন করার কৃতিত্ব লাভ করেছিলেন।
তার কাছ থেকে শিক্ষা অর্জন করে হাদিস বর্ণনা করেছেন সমকালীন অনেক বিখ্যাত উলামায়ে কেরাম। তন্মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনু সাম্মাক রহ., ওয়াকি ইবনুল জাররাহ রহ., যাইদ ইবনুল হুবাব রহ., আবু সুলাইমান দারানি রহ., মুসলিম ইবনু ইবরাহিম রহ. প্রমুখ অন্যতম।
ইলমে হাদিসে অবস্থান
হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদ রহ. তাঁর শিক্ষকমণ্ডলীর বরাতে প্রচুর হাদিস বর্ণনা করেছেন। তবে, জরাহ—তাদিলের অধিকাংশ ইমামের মতে তিনি হাদিস বর্ণনায় দুর্বল ছিলেন। অনেক মুনকার বর্ণনা তাঁর বরাতে পাওয়া যায়। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার এই দুর্বলতার কারণ হিসেবে ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, ‘তাঁর ইবাদতের মহব্বত অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে হাদিসশাস্ত্রে তিনি পরিপূর্ণ বুৎপত্তি অর্জন করতে পারেন নি।’
ইমাম জাহাবি রহ. বলেন, তিনি সালেকিনের মতাদর্শ আলোচনায় আত্মনিমগ্ন হয়েছিলেন। ফলে সালেকিনগণ তার অনুসরণ শুরু করেন। জাহাবি রহ. আরও বলেন, তিনি অনেকগুলো শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন এবং আল্লাহপ্রেমের সাগরে ডুব দিয়েছিলেন।
তাসাওউফের পথে
সুলুক ও তাসাওউফের ক্ষেত্রে তিনি হযরত হাসান বসরি রহ.এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বাইআত হওয়ার আগেও চল্লিশ বছর পর্যন্ত রিয়াজত—মুজাহাদা করেছেন। তাসাওউফের প্রতি তার মনোনিবেশের প্রেক্ষাপট বেশ হৃদয়গ্রাহী ও আগ্রহোদ্দীপক। তাঁর মালিকানাধীন এক গোলাম চুক্তি করেছিল যে, রাত্রিবেলা আমাকে কাজ থেকে অবসর দেওয়া হলে বিনিময়ে আমি এক দিনার করে দেব। এভাবে সে রাতে গোলামি করা থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছিল। কেউ একজন অভিযোগ করল, গোলাম রাত্রিকালে মজুরের কাজ করে। অন্য বর্ণনামতে, অভিযোগ ছিল, সে রাতে কাফন চুরি করে। অভিযোগ শুনে মালিক হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদ রহ. গোলামকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। একরাতে কাজ সমাপ্ত করে সে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল তিনি তখন তার পিছু নেন। চলতে চলতে গোলাম এক কবরস্থানে পৌঁছে গেল এবং সেখানে নামাজে মশগুল হয়ে গেল। ভোর অবধি নামাজে নিমগ্ন থাকল। প্রত্যুষে নামাজ শেষ করে দুহাত তুলে মুনাজাত করতে লাগল, ‘হে আমার বড় মালিক! আমার ছোট মালিকের পয়সা দিন।’ সহসা একটি দিনার গোলামের হাতে চলে এল। গোলাম দিনার হাতে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু, ছোট মালিক তখনও সেখানে লুকিয়ে বসে আছেন। হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদ রহ. উঠে দাঁড়ালেন এবং উজু করে দু রাকাত তাওবার নামাজ আদায় করলেন। নিয়ত করলেন, এমন আল্লাহওয়ালাকে তিনি আর গোলাম বানিয়ে রাখবেন না; মুক্ত করে দেবেন। সকালবেলা বাড়ির পথ ধরলেন। কিন্তু একি? চারপাশে সবই কেমন অচেনা—অপরিচিত। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন তার বাড়ি এখান থেকে অনেক দূর। ইত্যবসরে এক অশ্বারোহী তার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘হে আব্দুল ওয়াহিদ! এখানে বসে আছো যে? তিনি বিস্তারিত ঘটনা অশ্বারোহীকে শোনালেন। অশ্বারোহী বললেন, একটা দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়াও যদি এখান থেকে তোমার বাড়ি পৌঁছুতে চায়, দুবছর লাগবে। তুমি এখানেই অবস্থান করো। গোলাম রাতে আবারও এখানে আসবে এবং পূর্ববৎ ইবাদাত করবে। তার সাথেই তুমি ফিরতে পারবে।’ অগত্যা হযরত আব্দুল ওয়াহিদ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। রাতে গোলাম বেশ সুস্বাদু খাবারসহ উপস্থিত হলো এবং মনিবকে তা খেতে দিল। অতঃপর আগের মতই নামাজে মশগুল হয়ে গেল এবং যথারীতি শেষরাতে এক দিনার তার হাতে চলে এল। সকালবেলা মনিব গোলামের সাথে দু কদম হাঁটতেই বাড়িতে পৌঁছে গেল। বাড়িতে পৌঁছে গোলাম মনিবকে বলল, আপনি এমনটি আর করবেন না। আপনি নিয়ত করেছিলেন, আমাকে মুক্ত করে দেবেন। মনিব তাকে আযাদ করে দিলে সে মনিবের শুকরিয়া করে এবং হাদিয়া স্বরূপ কিছু কঙ্কর দিয়ে তৎক্ষণাৎ গায়েব হয়ে যায়। প্রত্যুষে ঘুম থেকে জেগে দেখেন সেইসব কঙ্কর একেকটি মহামূল্যবান মুক্তা। এই ঘটনা তাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, এরপর তিনি সম্পূর্ণরূপে দুনিয়া ত্যাগ করেন। পরবতীর্তে তিনি সেইসব মুক্তা বিক্রি করে গরিব—দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করে দেন।
উত্তম চরিত্র
একজন আল্লাহওয়ালার যেসকল গুণাবলী অপরিহার্য তার সবই হযরত আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু যাইদ রহ.এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও শিষ্টাচার। তাসাওউফের পথে আগমনের আগে থেকেই তিনি ছিলেন মানবদরদী। তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা সকল দাস—দাসীদের প্রতি তিনি ছিলেন রহমদিল। তাদের সাথে তার আচরণ ছিল নরম ও কোমল। এছাড়াও সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও কল্যানকামিতায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
তাকওয়া ও ইবাদত
তিনি ঐসকল মহান আল্লাহওয়ালাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যারা দিনের বেলা রোজা রাখতেন এবং রাত্রিবেলা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তিনদিন পরপর তিনি আহার গ্রহণ করতেন এবং সেটাও হতো কেবল কয়েক লোকমা। বর্ণিত আছে তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত রাত্রিবেলা বিছানায় পিঠ লাগান নি। পুরো রাত নামাজে কাটিয়ে দিতেন এবং ইশার ওজু দ্বারা ফজরের নামাজ পড়তেন। তাঁর এমন মুজাহাদায় মনযোগী হওয়ার পেছনে একটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ ইতিহাসের কিতাবগুলোতে পাওয়া যায়। ঘটনাটি তিনি নিজেই বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার রাতের বেলা আমার দুচোখে প্রচণ্ড ঘুম নেমে আসে। ঘুমের চাপে আমার দৈনন্দিন মা’মুলাত ছুটে যায় এবং আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের ঘোরে আমি স্বপ্নে দেখি, এক আনিন্দ্য সুন্দরী নারী আমার কাছে আসল। এমন রূপবতী নারী ইতিপূর্বে আমার দুচোখ দর্শন করে নি। তার গায়ে শোভা পাচ্ছিল রেশমি কাপড়। তার পাদুকাজোড়া ছিল তাসবিহে মশগুল। সে আমাকে সম্বোধন করল, হে ইবনু যাইদ! আমাকে পাওয়ার চেষ্টা করো। আমি তোমার অপেক্ষায় বসে আছি। এরপর সে একটি কবিতা আবৃত্তি করল যার অর্থ:
আমাকে যে কিনে নেবে এই হাটে/ হবে আমার হৃদয়ের স্বান্তনা
বেচে গেছে তার ক্ষতির হিসেব থেকে/ করতে এসেছিল যে প্রেমের সওদা
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মূল্য কত? সে উত্তর দিল, আমার দাম হলো, আল্লাহর সাথে মহব্বত আর প্রেমাকুল হয়ে তাঁর ইবাদত। আমার মূল্য হলো সেই দীর্ঘ চিন্তমগ্নতা যেখানে থাকে হৃদয়ের অস্থিরতা ও আকুলতা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে নারী! তোমার মালিক কে? উত্তরে সে বলল, আমার মালিক তো সেই মহান সত্তা, কোনো আকাংখি যদি তার কাছে আমার মূল্য অর্পণ করে তিনি ফিরিয়ে দেন না; ভালবেসে গ্রহণ করেন।
হযরত আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, এই স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম টুটে গেল। আমার কসম করলাম, আমরণ আর কখনও শয়ন করব না।
আখিরাতের পথে
তার মৃত্যুর তারিখ নিয়ে ইতিহাসবেত্তাগণের মাঝে মতভিন্নতা রয়েছে। কারও কারও মতে তার মৃত্যুর তারিখ ২৬শে সফর ১৭০ হিজরি। কারও মতে ১৭৬, কারও মতে ১৭৭, কারও মতে ১৭৮ আবার কারও মতে ১৮৬ হিজরি সনে তিনি ইন্তিকাল করেন। তবে, ইমাম জাহাবি রহ. ১৫০ হিজরির পরে তার মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনাকে বাতিল করে দিয়েছেন। তার মতে তিনি এর আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তার মাজার ইরাকের বসরা শহরে অবস্থিত।
খলিফাবৃন্দ
তাঁর খলিফাগণের মধ্যে হযরত ফুজাইল ইবনু ইয়াজ রহ., হযরত আবুল ফজল ইবনু রযিন রহ. এবং ইয়াকুব সুসি রহ. অন্যতম।