ইসলাম ও মুসলমানকে দমিয়ে রাখা, পরাজিত-পরাভুত করে রাখা ও ইহলৌকিক প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের‍ অস্ত্রের নিশানা বানিয়ে রাখার নিকৃষ্ট কুফরি প্রবণতা ও নোংরা মনোবৃত্তি বিগত তেরশ বছর যাবত সদাসজীব হলেও প্রকাশ্য যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে গোপনে বুদ্ধির কুটচালের শরণ নেওয়া অবধি মনোস্কামনা পূরণ বা কথিত বিজয় আস্বাদনের সুযোগ হয় নি ধূর্ত পশ্চিমা বেইমানদের। সত্য ও সততা, শৌর্য ও সাহসিকতার রাজপথ ত্যাগ করে শঠতা ও প্রতারণার নোংরা পাঁক-আকীর্ণ অন্ধ গলি হাতড়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে সরলপ্রাণ বীর মুমিনকে তারা পদানত, পরাজিত করেছে এবং শত বছরের নিরলস-নির্নিমিখ পরিশ্রমে ক্রমে ক্রমে তাদের পরিণত করেছে অন্ধ, মূর্খ, বাধ্য অনুগত দাসে। এভাবে সম্মুখ সমরে বীরত্ব প্রকাশের গর্বিত পথ ত্যাগ করে তারা নিরত হয়েছে বুদ্ধির শতরঞ্জ খেলায় এবং কুটবুদ্ধির দুর্ভেদ্য ফাঁদে আটকে ফেলেছে অকপট শ্যামল-হৃদয় মুসলিমদের। কুটকৌশলের এই ভয়ংকর খেলার নামই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন।

সুষুপ্ত মুসলিম মানসকে এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ করতে অনেক মুসলিম লেখক-গবেষক রচনা করেছেন অভিসন্দর্ভ, গ্রন্থ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ইত্যাদি। যথাসম্ভব তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ করে হৃদয়গ্রাহী বয়ানে তারা সতর্ক করেছেন কাফিরশক্তির চলমান এই নৈতিকতাবর্জিত ভয়ংকর আক্রমণ-আগ্রাসন সম্পর্কে। বিশেষত আরবি ভাষাভাষী আলিমগণ এই বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। উর্দুভাষী আলিমগণও রচনা করেছেন বেশকিছু অভিনব ও সুন্দর গ্রন্থ। পাকিস্তানের বিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ জামিআতুর রশিদ, করাচির ইতিহাস বিভাগের প্রধান মাওলানা ইসমাইল রাইহান হাফিজাহুল্লাহ রচনা করেছেন আলোচিত বিষয়ে অসাধারণ, অভূতপূর্ণ ও অনন্য গ্রন্থ। উর্দুতে গ্রন্থটির নাম রেখেছেন, নজরিয়াতি জঙ্গ কে মাহাজ। মাওলানা আহমাদ সাব্বিরের হাতে অনূদিত হয়ে নাশাত পাবলিকেশন থেকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত’ নামে ছেপে এসেছে বিগত আগস্ট মাসে। বইটি সম্পর্কে এই অবসরে দুএক ছত্র লেখার চেষ্টা করছি।

যা আছে বইজুড়ে

বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ, লড়াই বা আগ্রাসনের সংজ্ঞায়ন দিয়ে আরম্ভ হয়েছে গ্রন্থের। সাজানো হয়েছে সাতটি মৌলিক অধ্যায়ে। প্রথম অধ্যায়ে একে একে উঠে এসেছে বুদ্ধিবৃত্তিক সমরশাস্ত্রের সংজ্ঞা, বিষয়বস্ত, লক্ষ্য ও তাৎপর্য। উঠে এসেছে মুসলিম ও অমুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ব্যবধান ও শাস্ত্রীয়ভাবে ধর্মতত্ত্বের সাথে পার্থক্য।

দ্বিতীয় অধ্যায় নির্মিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ইতিহাসের ইট-পাথর দিয়ে। ত্রিশ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত পরিসরে কেবল আব্বাসী খিলাফাহর অন্তিম দিনগুলো পর্যন্ত সংঘটিত লড়াইসমূহের ইতিহাস অঙ্কিত হয়েছে এই অধ্যায়ে। সচেতন পাঠক বুঝবেন, এটা কেবলই প্রারম্ভিক আখ্যান। দ্বিতীয় অধ্যায়ের পর তাই তৃতীয় অধ্যায় হয়ে উঠেছে ইতিহাসেরই জরুরি অংশ।

তৃতীয় অধ্যায়ে বিবৃত হয়েছে ময়দানি ক্রুসেডের ইতিহাস। লেখক নির্মোহ ঢঙে তুলে ধরেছেন ক্রুসেড যুদ্ধের রক্তলাল অরুন্তুদ আখ্যান। অষ্টম ক্রুসেডের আলোচনার শেষান্তে লেখক বলেছেন, বস্তুত এখান থেকে সূচিত হয় আধুনিক বা প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। কারণ, রাজা সেন্ট লুই দীর্ঘ অনেক বছর আরবীয় পরিবেশে থেকে উপলব্ধি করেছিলেন, ময়দানের ‍যুদ্ধে মুসলিমদের হারানো অসম্ভব; তাদের লোকবল ও অস্ত্রশক্তি যত কম ও দুর্বলই হোক।

চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রসমূহ। অধ্যায়টি নিঃসন্দেহে এই গ্রন্থের শ্রেষ্ঠাংশ। পুরো অধ্যায়জুড়ে লেখক  যুদ্ধের ক্ষেত্রসমূহ সবিস্তার আলোচনা করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন সুইঁয়ের আগায় রেখে। আলোচনা করেছেন প্রাচ্যতত্ত্ব, উপনিবেশবাদ, বিশ্বায়ন ও খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতা নিয়ে। প্রায় দুইশ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ক্যানভাসজুড়ে তিনি প্রতিটি বিষয়কে এমন অণুপুঙ্ক্ষ বিশ্লেষণ করেছেন যে, একেকটি অধ্যায় পড়ার পর পাঠকের চিন্তার জগতে বিলোড়ন সৃষ্টি হতে বাধ্য। উপরন্তু পুরো অধ্যায়টি একসাথে পড়ে উঠতে পারলে পাঠকের সম্মুখে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে, বিগত কয়েকশ বছর যাবত পশ্চিম কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে মুসলমানদের বর্তমান হতদরিদ্রতায় পৌঁছে দিতে এবং প্রাচ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বিশ্বায়ন একটি অপরটির সাথে কতটা নিবিড় সম্পর্কে ব্যস্ত। পাঠকের সামনে পষ্ট হয়ে যাবে, কী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সমুদয় সম্পদের চেয়ে অধিক সম্পদের অধিকারী মুসলমান বণিকের সন্তানেরা হয়ে গেলো তাদেরই ‘চাকরি-খোঁজা’ গোলাম। বুঝবেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কীভাবে চুষে ছ্যাবড়া করে ফেলছে।

পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে কী কী শিরোনামে পশ্চিম তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই অব্যাহত রেখেছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে উঠে এসেছে পশ্চিমের যুদ্ধোপকরণ ও মাধ্যম। শিক্ষা সংস্কার, মিডিয়ার ব্যবহার ও নারী স্বাধীনতার নামে কী করে মগজ ধোলাই করা হয়েছে সবুজমন মুসলমানদের তার বেদনাকর বিবরণ উঠে এসেছে এই অধ্যায়ে। সাথে যুক্ত হয়েছে সামান্য খণ্ডনও।

সপ্তম খণ্ডে উঠে এসেছে কী করে এই অদৃশ্য আহবে আমরা বিজয়ী হতে পারি তার কার্যকর পরামর্শ। লেখক অত্যন্ত তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমাদের দুর্বলতাসমূহ শনাক্ত করেছেন এবং বলে দিয়েছেন নিরাময়ের উপায়।

এখানে কেবলই মুগ্ধতা ও প্রেম

বইটিকে কেবল অসাধারণ বললে অমর্যাদা হয়; কমসেকম দশবার বলতে হবে, অসাধারণ। বিষয়বস্তুর গুরুত্ব, আলোচনা ও বিশ্লেষণের পূর্ণাঙ্গতা ও অনুবাদের সৌন্দর্য; কোনো কিছুর কমতি নেই গ্রন্থজুড়ে। একটু খুলে বলছি।

প্রচ্ছদ ও নামলিপি : বইটি হাতে নেওয়ার পর প্রচ্ছদের নিম্নাংশে ‘ইতিবৃত্ত’ লেখাটিতে দৃষ্টি আকর্ষিত হয় অগোচরেই। এমন সুন্দরতর প্রচ্ছদ নির্মাণে প্রচ্ছদশিল্পী কাজী যুবাইর মাহমুদের অকুণ্ঠ প্রেম আর ঘাম যে ঝরাতে হয়েছে বেশ তা সহজ-অনুমেয়। তথ্যমতে প্রথমবার প্রচ্ছদ প্রকাশের পর পূনর্বার প্রচ্ছদে পরিবর্তন এনে শ্রী বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাঠকের প্রতি এটা ছিল প্রকাশনী ও প্রচ্ছদশিল্পীর প্রেমময় ‘হাদিয়া’।

উৎসর্গপত্র : যদিও বই-আলোচনায় এটি বিশেষ উল্লেখ্য গণ্য হয় না; আমার মনে হয়েছে এটিও অনুবাদকের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও গোপন অনুরাগের সাক্ষর বহন করে। গ্রন্থটি অনুবাদক উৎসর্গ করেছেন সময়ের সৃষ্টিশীল কবি, চিন্তক, দার্শনিক ও সাহসী লেখক মাওলানা মুসা আল হাফিজ যিদা মাজদুহুকে। নিচে ছোট্ট করে তার পরিচয় দিয়েছেন, ‘দুঃসময়ের বধ্যভূমিতে একজন স্বপ্নচাষী’। অগ্রজের প্রতি অনুজের এই শ্রদ্ধা ও অর্ঘ্য নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ী।

বিষয় ও বিশ্লেষণ : বই সংশ্লিষ্ট উপর্যুক্ত বিবরণী থেকে স্পষ্ট, বইটির বিষয় ও বিশ্লেষণ নেহাত উমদা ও মোহনীয়। লেখক মাওলানা ইসমাইল রাইহান তাঁর অন্যান্য বইয়ের মত এই বইয়েও স্বাতন্ত্র্য, সৃষ্টিশীলতা, অতলান্তিক অবগাহন ও গভীর পাণ্ডিত্যের অভিজ্ঞান এঁকে দিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই এমনসব মণিমুক্তো ছড়িয়ে দিয়েছেন যা পাঠককে ভাবতে ও বিস্মিত হতে বাধ্য করে। নিজের কথা যদি বলি, ক্রুসেড, উপনিবেশবাদ ও বিশ্বায়ন সম্পর্কে স্বতন্ত্র পাঠ একদম কম হয় নি ইতিপূর্বে। কিন্তু লেখক যখন অসাধারণ কুশলতায় এই তিনটি বিষয়কে একই সুতোয় গেঁথে উপস্থাপন করলেন এবং আমি যখন তিনটির ইতিহাস পূনর্পাঠ করে উঠলাম, মনে হলো, আশ্চর্য, এভাবে তো ভেবে দেখি নি আগে। আগে তো মনে হয় নি এই তিনটি বিষয়কে একের পর এক জন্ম দেওয়া হয়েছে মুসলিমদের পদানত করে রাখতে। বিশ্বায়নের আলেয়ায় যেটুকু আলো বলে বিশ্বাস করে লোকে সেটুকুও সে নির্জলা প্রপঞ্চ তা জেনে সহসা চমকে উঠেছি।

অনুবাদ : ইতিপূর্বে এক ভিডিওতে স্বীকার করেছি, লেখক আহমাদ সাব্বিরকে যেমন ভাল লেগেছে প্রথম রচনা থেকে অনুবাদক আহমাদ সাব্বিরকেও ভাল লেগে গেছে এই বই থেকে। একটি বিশ্লেষণধর্মী শাস্ত্রীয় বইকে যেমন অভিজাত শব্দে ও বাক্যে অনুবাদ করতে হয় সাব্বির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে সেই মান বজায় রেখেছেন সচেতনভাবে। একটি নিপাট গবেষণামূলক রচনাকে সহজিয়া অনুবাদের নামে গল্প-উপন্যাসের ‘তরল’ ভাষায় উপস্থাপন করেন নি। লেখক ও অনুবাদক হিসেবে এটা তার সক্ষমতা ও সামর্থের প্রমাণ। বিগত বছরগুলোতে ভাল অনুবাদের তকমা পাওয়া বেশকিছু বই পড়ে মনে হয়েছে, অনুবাদক আসলে জানেনই না সব বই উপন্যাস বা গল্প না; কিছু বই ভারী শব্দ, বৈভবপূর্ণ বাক্য ও অভিজাত প্রকাশভঙ্গির দাবি রাখে। সাব্বির সেটা জানেন এবং তার সাক্ষ্য এই গ্রন্থ। আপন সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে ইতোমধ্যে তিনি লেখকজনদের আড্ডায় নিজেকে পরিচিত করে ফেলেছেন। শুভানুধ্যায়ী, সুহৃদজন ও ভক্ত পাঠকদের ভালবাসার দাবি অনেক গুণ বাড়িয়ে তুলেছেন নির্দ্বিধায় বলা যায়।

শেষকথা

অনেকদিন পর বাংলায় অনূদিত একটি অসাধারণ গ্রন্থ পাঠ করে ‍উঠলাম। নিঃসন্দেহে বাংলাভাষায় বইটি বিশেষ সংযোজন। বইটি প্রকাশের জন্য অনুবাদক ও প্রকাশককে শুকরিয়া ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। বইটি বিশ্ববিদ্যালয় ও জামিআগুলোতে অবশ্যপাঠ্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তাদের সিলেবাসে বইটি যুক্ত করা অবশ্য কর্তব্য। বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের এই ইতিবৃত্ত না জেনে যতই প্রচেষ্টা করা হোক, আখেরে গোলাভরা ধান যাবে শত্রুর ভাণ্ডারে। 

বইপাঠ – ৪

বই : বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত

লেখক : মাওলানা ইসমাইল রাইহান

অনুবাদক : মাওলানা আহমাদ সাব্বির

প্রকাশক : নাশাত পাবলিকেশন

প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২১ ইংরেজি

মুদ্রিত মুল্য : ৪৭৫ টাকা

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট