প্রায়শই জেনারেল থেকে উঠে আসা কিছু ভাই অত্যন্ত দরদী ঢঙে কওমি মাদরাসার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে থাকেন। কারও মন্তব্য থাকে দুএক লাইনের, কারও মন্তব্য হয় ‍সুবিশাল জ্ঞানগর্ভ পোস্টের মাধ্যমে। প্রায় সবগুলো মন্তব্যের শুরু ও শেষে ঘুরেফিরে যে বক্তব্য থাকে, ‘কওমি মাদরাসা যুগের চাহিদা ও সময়ের ডাক বুঝতে পারে নি। তাদের উচিত সময়ের ডাক অনুযায়ী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা।’ কেউ কেউ জোর গলায় ‘পশ্চাদপদ’ ‘জনবিচ্ছিন্ন’ ‘মধ্যযুগীয়’ ইত্যাকার শব্দ ও শব্দবন্ধও যুক্ত করেন। কারও কারও সমালোচনা হয় আরও রূঢ়। কিন্তু চোখ কান খোলা যারা রাখেন, কওমি মাদরাসার পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যক্রমের কার্যকারিতা সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল এবং প্রকৃতার্থেই যারা শিক্ষা, শিক্ষার ইতিহাস ও শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যারা জ্ঞাত, তারা এসব ‘পাতলা’ কথা বলার আগে নিজেকে সংযত করেন। সবারই করা উচিত।

এমন চিন্তা বা বক্তব্যকে পাতলা কেন বললাম, সেটা ব্যাখ্যা করা কিছু দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য চিন্তাশীলদের সম্মুখে আমি কিছু প্রশ্ন রাখবো। তার আগে একটা জরুরি কথা বলে ফেলি; এই যে যারা অভিযোগ করেন, তাদের অধিকাংশ লোক কিন্তু জানেন না, ঠিক কী কী পড়ানো হয় কওমি মাদরাসাতে। তারা জানেন না, প্রতিষ্ঠাকালীন পাঠ্যক্রম ও বর্তমান পাঠ্যক্রমের সঙ্গে ঠিক কতটা অমিল বিদ্যমান। এবং এসব সংযোজন-বিয়োজন-সংশোধনী যে কওমি শিক্ষাক্রমের একটি নিয়ত চলমান ঘটনা, এটাও তারা অবগত নন। তারা এখনও ভাবেন, মান্ধাতা আমলের পাঠ্যক্রম মেনে চলছে মাদরাসাগুলো। ফলে তারা পিছিয়ে পড়ছে। ঠিক কোথায় কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, সেটা আদৌ বোধগম্য নয়।

মজার কথা বলি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে ‘গ্রুপস্টাডি’র গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। এটাকে তারা অত্যন্ত কার্যকরী পঠনপন্থা বলে স্বীকার করছে। কী আশ্চর্য, মান্ধাতা আমলের কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় এটা চলছে সেই আদিকাল থেকে! এবং এর কল্যানেই এখনও কওমি মাদরাসাতে ‘কোচিং বানিজ্য’ ঢুকতে পারে নি। দুদিন আগে এক ভিডিওতে দেখলাম, কোচিংয়ের রমরমা ব্যবসার পেছনে শিক্ষকদের স্বল্প বেতনকে প্রধান কারণ বলা হচ্ছে। তো, কওমি মাদরাসার উস্তাদগণের চেয়ে স্বল্প বেতনের শিক্ষক কি পুরো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে?

পাতলা কেন বললাম সেটা বোঝার জন্য কয়েকটি কথা :

একটা শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণ, সংস্কার, সংযোজন-বিয়োজন ও সংশোধনের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত রাখা জরুরি :

১. উদ্দেশ্য কী? কেন এই শিক্ষাব্যবস্থা? কোন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য এই শিক্ষাধারা গড়ে উঠবে? কওমি মাদরাসার পক্ষে ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য’ তুলে চমৎকার বক্তব্য দিয়ে প্রিয় হয়ে ওঠা একজন সম্মানিত প্রফেসরকে বলতে দেখলাম, ‘হ্যাঁ, কওমি মাদরাসা পরবর্তীতে ভুল করেছে। তারা শিক্ষাকে উপার্জনমুখী করে নি। এটা তাদের ভুল। এজন্যই তারা পিছিয়ে পড়েছে।’ দেখে বেশ কষ্ট পেলাম। তারচেয়ে কষ্ট পেলাম, অনেক ‘বড়’ ভাইকে তার সমর্থন করতে দেখে। কারণ আর কিছু নয়, এই শিক্ষাব্যবস্থার গরজ-গায়াত, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে অনবগতি।

২. উদ্দেশ্য পূরণে কী কী যোগ্যতা অনিবার্য, কী কী যোগ্যতা সহায়ক ও কল্যানকর এবং কী কী যোগ্যতা সহায়ক? : দ্বিতীয় পর্যায়ে এই প্রশ্নের মর্ম বুঝতে হবে ও উত্তর জানতে হবে। যারা উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন তারা এই স্তরে উঠতে পারেন না। বস্তুত, এই স্তরে চিন্তা না করে সামনে এগোনো মানে, মারাত্মক অনধিকার চর্চা। মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ সাহেব যিদা মাজদুহু ও ত্বালা বাক্বাউহুর মাদানি নেসাবের ওপর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ যেমন, আত-তারিকু ইলাস সরফ, আত-তারিকু ইলাল বালাগাহ ও সদ্য প্রকাশিত আত-তারিকু ইলাল উরদিয়াহর দ্বিতীয় খণ্ডের ভুমিকা দেখলে এ ব্যাপারে চিন্তার সুযোগ মিলবে।

৩. অনিবার্য যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে কী কী গ্রন্থ পড়া অপরিহার্য (যা পরিবর্তনযোগ্য নয়), কী কী গ্রন্থ পাঠ আবশ্যক (তবে উত্তম বিকল্প পাওয়া গেলে শীর্ষব্যক্তিবর্গের পরামর্শে পরিবর্তনযোগ্য) এবং কী কী গ্রন্থ সহায়ক (তথা শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পরিবতর্নযোগ্য)? তৃতীয় স্তরে এসে এই নির্ণয় অত্যন্ত সুক্ষ্ম, ঝুকিপূর্ণ ও জরুরি। বলাবাহুল্য, এজন্য চাই অভিজ্ঞ-জ্ঞানতাপস ও শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল ব্যক্তিবর্গের দল। এই স্তরে একক ব্যক্তির চিন্তা ও গবেষণা অনেক সময় আশানুরূপ ফল দিতে পারে না।

৪. সবশেষ, যেটা অতি দরকারি ও জরুরি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেধা মন ও মনন এবং যুগ ও পরিবেশ অনুযায়ী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন।

আশা করি, উপর্যুক্ত প্রশ্নগুলোর সমাধান কত জটিল ও গবেষণাসাপেক্ষ তা বলে বোঝাতে হবে না। কিন্তু এতকিছু না ভেবে যারা ‘সিলেবাস বদলাতে হবে’ ‘সংস্কার করতে হবে’ ‘যুগের সাথে মেলাতে হবে’ ধরণের মন্তব্য করেন; উপরন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে একদম না জেনে ‘বড় বড় গবেষণাপত্র’ প্রকাশ করে ফেলেন তাদের কথা ও মাথাকে পাতলা বলা কি অন্যায়? অনধিকার চর্চাকারীকে আপনারা কী বলেন?

কওমি শিক্ষাধারায় যে পরিমাণ পরিবর্তন, বিয়োজন, সংযোজন, সংশোধন ও সংস্কার আজ পর্যন্ত হয়েছে, আমি জানি না, অন্যকোনো শিক্ষাব্যবস্থায় হয়েছে কি না। কিন্তু, এর খবর অনেকে রাখেন না । যারা রাখেন তাদের অনেকে সংশোধনের কথা কেবল এজন্য বলেন, কারণ এখানে ইংরেজি এবং বিজ্ঞান পাঠ দুর্বল। কিন্তু এই বিষয় দুটো এই শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের জন ঠিক কতখানি জরুরি বা সহায়ক তারা সেটা বিবেচনা করেন না। আবার এ দুটো বিষয় ঠিক কতজনের ও কী পরিমাণ জানা জরুরি সেটারও কোনো যথোপযুক্ত বয়ান নেই। উপরন্তু যে ইংরেজির প্রতি এত টান, এত মায়া, এত মোহময়তা, একজন সচেতন গায়রতবান মুসলমান সেই ‘ভাষামাত্রের’ ক্ষতি খোলা চোখেও দেখতে পান। কেবলমাত্র একটি ভাষা হওয়ার পরও ইংরেজি কীভাবে মন-মগজ-চিন্তা-বুদ্ধিবৃত্তি-আকিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তা দিব্যচোখে তারা দেখেন। ফলে মিসবাহ সাহেবের মত ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার মহান ‘মুজাদ্দিদ’ও তার সংস্কৃত ও পরিমার্জিত পাঠ্যক্রমে ইংরেজি প্রবেশ করতে দিতে নির্দ্বিধ নন। ইংরেজিপ্রীতি আমাদের কোথায় পৌঁছে দিতে পারে সেটা ‘আলিয়া’ মাদরাসাগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হবে না। ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাওয়া এক্ষেত্রে নিষ্প্রয়োজন।

সংস্কার, সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না সেটা যোগ্যব্যক্তিদের বলতে দেওয়া উচিত; যদি উপর্যুক্ত যোগ্যতাগুলো না থাকে অযথা এসব ‘পাতলা’ বক্তব্য দিয়ে ক্যাচাল তুলে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা থেকে বিরত থাকা উচিত, আল্লাহর ওয়াস্তে। এসব চটকদার কথার ফাঁদে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে ‘চোরাবালি’তে ডুবেছে, মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি পরীক্ষা দেওয়ার সুব্যবস্থা রেখেও পড়ে তা বাতিল করতে হয়েছে অনেক মানসম্পন্ন মাদরাসার। সঠিক নিরুপণ ও নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়ায় ‘বাংলাদেশী’ অনেক কওমি মাদরাসা যথাযথ ফসল ঘরে তুলতে পারছে না। মানতিকশাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্রের বিদায় দিয়ে এখন বেশ খানিকটা ‘মেরুদণ্ডের’ দৌর্বল্যে ভুগছে মাদরাসাগুলো। (আশ্চর্য হলো, খোদ দেওবন্দসহ ভারত-পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোতে এখনও যথারীতি দর্শনশাস্ত্রের ‘মাইবুজি’ পড়ানো হয়। সুল্লামুল উলুম পড়ানো হয়। আরও অনেক গ্রন্থ পাঠ্যতালিকায় বিদ্যমান। কিন্তু জানি না কেন, বাংলাদেশে এগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।) এসবই হয়েছে সংস্কার করতে গিয়ে; নিরুপণ ও নির্বাচন যথাযথ না হওয়ায়। এখনও অনেক মাদরাসা ইচ্ছেমত পাঠ্যতালিকা সাজাচ্ছে। বিশেষত, মাদানি ও দরসে নিজামির শঙ্কর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অনেক। এগুলো আখেরে কতটা লাভজনক হচ্ছে ভবিষ্যত বলে দেবে। আপাতত বলতে পারি, এই যথেচ্ছা সংস্কার বা সংস্কারের দাবি ভাল প্রবণতা নয়। যারা মাদরাসার ভেতরের লোক নন এ ব্যাপারে কথা বলা তাদের জন্য উচিত মনে হয় না। কওমি ঘরানার আলিম ও তালিবুল ইলমদেরও সতর্ক ও সজাগ থাকা উচিত। ভুলে যাবেন, খোদ মাওলানা আবদুল মালিক সাহেব বলেছেন, ‘এ ব্যাপারটা বড়দের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ আমাদের উচিত এই বক্তব্য মুখস্থ করে নেওয়া।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট