নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুনিয়াতে চারটি কাজ দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল যা কুরআন কারিমের তিনটি সুরার চারটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন। সুরা আল ইমরানের ১৬৪তম আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে :
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
“আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবি পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন। বস্তুত, তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট।”
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন দায়িত্ব যথাযথ ও সুচারুরূপে পালন করে গেছেন। উম্মতকে তিনি এই চার কাজ শিখিয়ে গেছেন এবং এই চার কাজের দায়িত্ব পরবর্তীদের ওপর অর্পণ করে গেছেন। নবিজির উম্মত হিসেবে আমাদের উচিত দৈনন্দিন কর্মতালিকায় এই চারটি কাজ অবশ্যই রাখা। প্রাত্যহিক কর্মসূচি তৈরীর সময় তালিকায় সবার উপরে লিখে রাখা :
১. কুরআন তিলাওয়াত করা।
২. কুরআন বোঝার চেষ্টা করা। এটা হবে তিনটি পদ্ধতিতে :
ক. কুরআনের বিশুদ্ধ অনুবাদ পাঠ।
খ. যোগ্যতা অনুযায়ী কুরআন কারিমের বিশুদ্ধতম তাফসির পাঠ।
গ. কুরআন কারিমের ইলমে পারদর্শী ব্যক্তির সাহচর্য। (এটা দৈনন্দিন রুটিনে না রাখলেও সাপ্তাহিক বা মাসিক তালিকায় রাখা বাঞ্ছনীয়)
৩. হিকমত শিক্ষা করা। এটা তিন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে :
ক. হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধ্যয়ন।
খ. ফিকহে ইসলামির পাঠ। (অনুসৃত মাজহাব অনুযায়ী)
গ. হাদিস ও ফিকহ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির সাহচর্যে গমন। (দৈনন্দিন সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে হওয়া জরুরি)
৪. তাযকিয়া অর্জনের চেষ্টা। এটাও সাজানো হবে তিনটি কাজ সামনে রেখে :
ক. সকাল-সন্ধ্যার জিকির।
খ. মাসনুন দুআগুলো গুরুত্ব সহকারে যথাসময়ে আদায়।
গ. আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে গমন।
বিশাল তালিকা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে, এসব করেই তো দিন শেষ, দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের কাজ করবো কখন? এগুলো করতে কি অত সময় লাগবে যতটা সময় ফেসবুকে ‘অযথা’ ব্যয় হয়? আচ্ছা, সহজ পথ বের করার চেষ্টা করি।
১. প্রত্যেক নামাজের কিছুক্ষণ আগে মসজিদে চলে যাওয়া। প্রতি ওয়াক্তের সুন্নাত বা নফল আদায়ের পর কুরআন কারিম থেকে দুটো পৃষ্ঠা পাঠ। পাঁচ ওয়াক্তে আধা পারা। দু মাসে ইনশাআল্লাহ এক খতম সম্পন্ন হয়ে যাবে।
২. রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা হাদিস, দুটো মাসআলা তালিম করা। এক্ষেত্রে ফাজায়েলে আমাল, ফাজায়েলে সাদাকাত, হিকায়াতে সাহাবা, আহকামে জিন্দেগী বা বেহেশতি জেওর সামনে রাখা যায়। হিকমত শেখার কাজ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
৩. গুরুত্বের সাথে প্রত্যেক নামাজের পর মাসনুন জিকিরগুলো করে ফেলি। হুট উঠে না পড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকি। এই বসে থাকাকেও বিশুদ্ধ হাদিসে ‘ইসলামি ভূখণ্ড পাহারা দেওয়ার সমতুল্য সাওয়াবের আমল’ বলা হয়েছে।
৪. ফজরের পরপর কিছু সময়ের জন্য ‘তাফসিরে তাওজিহুল কুরআন’ নিয়ে বসে যাই। ফ্রেশ মনে খানিকটা তরজমা ও বিশুদ্ধ তাফসির পড়া হয়ে যাবে।
৫. খাওয়া, ওঠা-বসা ইত্যাদি নিত্য-নৈমিত্তিক কাজের সময় যেসব মাসনুন দুআ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন, সেগুলো গুরুত্বের সাথে আদায় করি। কাজগুলো তো আমাকে করতেই হয়; কোনরকম সময় ব্যয় না করেও এই ‘বিরাট’ আমল করে ফেলতে পারি।
৬. এলাকায় যদি কোনো আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ যোগ্য আলিম থাকে সপ্তাহে বা মাসে একদিন তার সাহচর্যে যাওয়ার অভ্যাস করা। এতে একইসাথে হাদিস, ফিকহ ও তাযকিয়ার শিক্ষা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। যদি একান্তই যাওয়া সম্ভব না হয়, অন্ততপক্ষে, তার অনুমতি সাপেক্ষে ফোন বা চিঠিপত্রে যোগাযোগ রাখা। সান্নিধ্যের সৌরভ অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আসলে কাজগুলো সময়সাপেক্ষ বা কঠিন না; দরকার মানসিক সচেতনতা ও গুরুত্ব। অন্তর্জাল আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা করেছে, আমল করার উদ্যম, স্পৃহা ও মানসিক শক্তি ক্ষয় করে দিয়েছে। এমন ক্ষয়িষ্ণু, দুর্বল ও গাফেল অন্তর নিয়ে রব্বে কারিমের সামনে হাশরের ময়দানে কী করে দাঁড়াবো? ফুজাইল ইবনু ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ তো নিজের দাঁড়ি মুঠ করে ধরে অপরাধীর মত জমিনে হাটু গেড়ে বসে আসমানের দিকে তাকিয়ে বলতেন, হে আল্লাহ! এই মুখ নিয়ে আমি তোমার সম্মুখে দাঁড়াতে পারবো না।
বি. দ্র. যারা আলিম ও তালিবুল ইলম আছেন, এই চার কাজকে অন্যদের কাছে পৌঁছানো তাদের কর্মতালিকায় থাকা উচিত।