হালাল-হারাম মুসলিম জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল গ্রহণ ও হারাম বর্জন করে চলা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় আখিরাতে শাস্তি অনিবার্য।
মহান রব্বুল আলামিন সর্বপ্রথম নবি-রাসুলগণকে হালাল-হারাম মেনে চলার আদেশ করেছেন। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে: ‘হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকর্ম করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত-৫১) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা মুসলমান বান্দাদের সম্বোধন করে ইরশাদ করেন: ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি রুজি হিসেবে তোমাদের দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহ তায়ালার, যদি তোমরা তারই বন্দেগি করে থাক।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত-১৭২) হালাল পণ্য ত্যাগ করে হারামে লিপ্ত হওয়ার প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে: ‘আমার দেওয়া পবিত্র বস্তসমূহ আহার করো এবং এতে সীমালঙ্ঘন করো না, তাহলে তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে এবং যার ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসে সে ধ্বংস হয়ে যায়।’ (সুরা ত্ব-হা, আয়াত-৮১)
হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা পবিত্র। তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রেরিত রাসুলদেরকে যেসকল বিষয়ের আদেশ করেছেন, মুমিনদেরকেও একই জিনিসের আদেশ করেছেন।’ অতপর তিনি সুরা বাকারার ১৭২ নম্বর আয়াত ও সুরা মুমিনুনের ৫১ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন। এরপর, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এক মুসাফিরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার চুল আলুথালু এবং চেহারা ধুলিমলিন হয়ে গেছে। সে আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোআ করছে, ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং তার উদর পূর্তি হয়েছে হারাম খাবার দ্বারা। তার দোআ কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম শরিফ, হাদিস-১০১৫)
সুখের কথা হলো, পৃথিবীজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমবর্ধমানহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা হালাল ভোক্তার সংখ্যাবৃদ্ধিকে প্রতিভাত করে তুলেছে। বিগত দশ বছরে বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদাবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে পৃথিবীর মোট খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ১৬ শতাংশের অধিক হালাল পণ্যের যোগান দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী হালাল করার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা, সেমিনার এবং প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে। উপরন্তু, হালাল পণ্যের চাহিদা কেবল খাদ্যদ্রব্যে আটকে নেই; রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে শুরু করে হোটেল, ব্যাংক, ওষুধ, কসমেটিকস সর্বত্র এর চাহিদা ব্যাপকহারে সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যটন ক্ষেত্রেও হালাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে সম্প্রতি।
থমসন রয়টার্সের দ্য স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্টে (২০১৭-২০১৮) বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বিশ্বে দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের হালাল পণ্য ব্যবহার হয়েছে। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল এক দশমিক নয় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২ সালে হালাল বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়াবে তিন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এর পরিমাণ চার ট্রিলিয়ন অতিক্রম করতে পারে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার পরিমাণ। বর্তমানে শুধুমাত্র আমেরিকান মুসলমানদের ক্রয়ক্ষমতার সূচক দাঁড়িয়েছে ১৭০ বিলিয়ন ডলার। বাড়ছে মুসলিম বিশ্বের জিডিপির হারও। ফলে বিশাল এই বাজারের দখল নিতে হামলে পড়ছে বিশ্বের উন্নত দেশ ও নামজাদা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। টেসকো, নেসলে, ম্যাকডোনাল্ডের মত মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আগেভাগেই বাজারে নেমে পড়েছে; হালাল পণ্যের মেনু তৈরী করেছে। ফলে হালাল পণ্যের এই বিশাল মার্কেটের বড় অংশটিই তাদের দখলে। উদাহরণত, সৌদি আরবের মত মুসলিম-প্রধান দেশে হালাল মুরগি সাপ্লাই করছে ব্রাজিল। হালাল উপায়ে জবেহকৃত বকরির যোগান দিচ্ছে নিউজিল্যান্ড। বৃটেন ও কানাডার ওষুধ কোম্পানিগুলো হালাল ওষুধ ও ভিটামিন তৈরী করে মুসলিম দেশগুলোতে রপ্তানি করছে। হালাল হিজাবি শ্যাম্পু বাজারে নিয়ে এসেছে সানসিল্ক। আতরের সুগন্ধিমাখা সাবান এনেছে লাইফবয়। অপরপক্ষে, হালাল পণ্যের এই বিশাল বাজারে মুসলিম প্রধান দেশ বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম।
উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্বে হালাল ফ্যাশনের বাজার ছিল ২৫৪ বিলিয়ন ডলার। যেখানে শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে আছে ইতালি, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, শ্রীলংকা ইত্যাদির মত অমুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র।
চলতি বছরের ৪ঠা এপ্রিল কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক বানিজ্য ও শিল্প বিষয়ক মন্ত্রনালয় (MITI) এবং বৈদেশিক বানিজ্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের (MATRADE) যৌথ উদ্যোগে ১৫তম আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। প্রদর্শনীর নামকরণ করা হয় Malaysia International Halal Showcase (MIHAS)| আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হালাল পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়, ফ্যাশন, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রসাধনী, অর্থায়ন বা আর্থিক সেবা, পর্যটন খাতের হালাল পণ্য ও সেবার প্রদর্শনী হয়ে থাকে এই আয়োজনে। গত বছর কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এই মেলায় মোট ৮০টি দেশের ২২ হাজার ৭৪৪ জন ক্রেতা-দর্শনার্থীর অংশগ্রহণে এ প্রদর্শনীতে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সরাসরি বানিজ্য হয়েছে। চলতি বছর ৭২টি দেশ থেকে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ২১ হাজারের অধিক। নগদ বিক্রির পরিমাণ ছিল এক দশমিক বাহাত্তর বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিট। চারদিন ব্যাপী এই প্রদর্শনীর পরবর্তী সময় নির্ধাারিত হয়েছে ২০১৯ সালের ৩-৬ এপ্রিল।
এছাড়াও ২০১৪ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রথমবারের মত ‘আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনী’ যাত্রা শুরু করে; যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদুত। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত সহ বিশ্বের মোট ৬০টি কোম্পানি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে। ২০১৭ সালের জুনে তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনীতে মোট দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার ৫৯৯ জন। এসকল প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলো, অমুসলিম দেশগুলোতে হালাল পণ্য সহজলভ্য করা, হালাল পণ্য নিরীক্ষণের মাধ্যম সহজলভ্য করা, সচেতনতা সৃষ্টি ও ভোক্তা আকৃষ্ট করা এবং হালাল পণ্য সাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এছাড়াও হালাল মার্কেটিংকে বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যেও এসকল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হালাল পণ্যের ব্যাপক জয়জয়কার নিঃসন্দেহে মুসলমানদের জন্য আশাব্যঞ্জক। মুসলিম-প্রধান দেশসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা এবং অন্যান্যদের পথপ্রদর্শন করা ছিল ইমানি দায়িত্ব। আফসোসের কথা হলো, অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই হালাল পণ্যের বানিজ্যে উন্নাসিকতা প্রকট। বিশেষত, বাংলাদেশের অবস্থা এক্ষেত্রে চরম শোচনীয় ও লজ্জাজনক। তথ্যমতে, ২০১১ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক হালাল পণ্যের সার্টিফিকেট দেওয়া শুরু হয়। আট বছরে মোট সার্টিফিকেট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০টিতে। সনদপ্রাপ্ত হালাল পণ্যের সংখ্যা সাকুল্যে ১০০টি। কয়েকটি জবাইখানাও হালাল সনদ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। গার্মেন্টস ও ফ্যাশন হাউসগুলোর এক্ষেত্রে অনাগ্রহ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২৫-২-২০১৮ইং তারিখে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি কলামে জানা যায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপপরিচালক মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারি সমকালকে জানিয়েছেন, ‘এখনও কোনো তৈরী পোশাক কোম্পানি হালাল সনদ গ্রহণ করতে আসে নি।’ অথচ, রপ্তানিক্ষেত্রে পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী মাধ্যম। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া ছিল বাঞ্ছনীয়।
ব্যবসায়ী কমিউনিটিগুলোকে এখনই হালাল পণ্যের আমদানি-রপ্তানির দিকে মনযোগী হতে হবে। এতে করে ব্যবসায়ী ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার সাথে সাথে আখেরাতেও তারা অধিক সওয়াবের অধিকারী হবেন। হালাল পণ্যের প্রসার ও হারাম পণ্যের বাজার হ্রাস করার বিরাট সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হবে। কেবল ব্যবসায়িক লাভ অর্জনে আগ্রহী অমুসলিম দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি। বিস্তর গবেষণা করে হালাল পণ্যের ব্যবসায় নতুনত্ব সৃষ্টিতে অগ্রসর হতে হবে। বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের ব্যবসাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোরও উচিত হালাল পণ্য ব্যবসায়ীদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা।
প্রকাশিত: ইসলাম ও জীবন, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, ১১-১১-২০১৮ ইং।