ফজরের আজান তাকে স্পর্শ করে না কত বছর হয়ে গেল! এক পরম প্রার্থিত মোহময়তা বুঁদ করে রাখে যতক্ষণ না জানালা গলে আসা সূর্যরশ্মি চোখ ধাধিয়ে দেয়। সম্পর্কের হিসেব কষে জীবন চলে না। সম্পর্ক আসে খেই হারানো ঢেউয়ের মত অদ্ভুত দ্যোতিত ছন্দে। দুলতে থাকে, দোলাতে থাকে যা কিছু আশ্রয় করে থাকে তাকে নিঃস্ব হাড়সর্বস্ব কাঙালের মত। সম্পর্কের হিসেব করা তাই অযথা, ভাবে সাদ। কেউ বলে ভাগ্য তার ভাল, কেউ বলে রাশিতে সে কন্যা, কেউ কটাক্ষ করে বলে শালা একটা মাল। সাগরের ফেনায়িত নোনা পানির মত ছুঁয়ে থাকে তাকে সুন্দরের প্রতিমা মেয়েগুলো। কারও ঈর্ষা হয়, দুয়েকজন আফসোস করে। কোনোকিছু নিয়েই তার বিশেষ আদিখ্যেতা বা অত্যুৎসাহ নেই। কোনো মেয়েকে ঘিরে বিশেষ স্বপ্নও তার তৈরী হয় নি। কাউকে ফেরাতে পারে নি সে; ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবও ছিল না কখনও। জীবনে সে কেবল ভয় পায় একাকিত্বকে। একটা অস্থির দ্বিচারিতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ভয় হয় তার; অথচ, একাকি নিঃসঙ্গ যে সাদ সে নিজের ভেতর ধারণ করে ভিন্ন চরিত্রের দুজন সাদকে। একজন বড় বেশী নির্লজ্জ, আরেকজন সাক্ষাত ফেরেশতা।

 ইরিনের ফোন কেটে যাওয়ার পর মনে হল, কাছের মসজিদে আজান হচ্ছে। সারারাত্রির সংলাপ শেষে শুতে যাবে ভেবেছিল। গত কয়েকবছর যাবত এটাই নিত্যকার রুটিন। মানুষ বদলেছে। রাত্রি, সামিহা, আরিবা, শম্পারা এসেছে, আবার প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে গেছে তাদের গন্তব্যে। শূন্যস্থানে জায়গা নিয়েছে নতুন নিশাচর পাখি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েছে পাল্টেছে চাহিদা ও আবদারের ধরণ। শুরুর যৌবনে যে চাহিদা ছিল কেবলই কল্পনাবিলাস, আজ তা ঘটমান সত্য। বিনা আবদারেই ধরা দিচ্ছে এমনসব মহার্ঘ নৈবেদ্য, বুভুক্ষু হৃদয় যার জন্য ছিল ব্যাকুল, উৎকণ্ঠিত।

একটুখানি অপরাধবোধ যেন ছুঁয়ে গেল সাদকে মুহূর্তখানিকের জন্য। মা বলতেন, ‘জীবনে কোনো মেয়ের দিকে খারাপ নজরে তাকাবি না।’ মা খুব নামাজি ছিলেন। বাবাও ছিলেন নামাজি মানুষ। লোকজন মুনশি বলে ডাকত বাবাকে। গায়ে অল্প দামের পাঞ্জাবির সাথে মাথায় টুপি পরতেন বাবা। তিনমাস লিভারের রোগে কষ্টভোগ করে মারা গেলেন এক শুভ শুক্রবারে। বাবার মৃত্যুর তিন ঘন্টার মাথায় মা তার পরকালের সঙ্গী হলেন। রহিমা খালা বলছিলেন, আহা রে! কী ভালবাসা আছিল দুইজনের মইধ্যে। জামাইয়ের মরণ সহ্য করতে পারে নাই মানুষটা। আল্লাহ দুইজনরে বেহেশত নসিব করুক।

 ভালবাসার এত তীব্র শক্তি হয় তাহলে? ধন্দ হয় সাদের। গত চারবছরে কুড়িখানেক মেয়ের মুখে ভালবাসি শুনেছে সে। তারা সবাই চলে গেছে। সর্বশেষ আজ রাতে বিদায় নিল ইরিন। তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে। খানিক কেদেকেটে তারপর অনর্গল কথা বলে গেল, যেন কিছুই হয় নি। শুভকামনা জানিয়ে ফোন যখন ছাড়ল তখন মনে হচ্ছিল, বেশ ভাল একটা জার্নির প্রস্তুতি নিচ্ছে মেয়েটা। কই, মরণ টেনে আনতে পারে এমন তীব্র টান তো ভালবাসায় নেই।

প্রচ- হইহুল্লোড়ে ভাবনায় ছেদ পড়ল। বাইরে কারও কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। না, অনেক মানুষের কণ্ঠ। কেউ কাঁদছে, কেউ ডাকাডাকি করছে। কেউ বুঝি মারা গেল এই শেষ রাত্রিতে। প্রতিবেশী কেউ অসুস্থ ছিল বলে জানে না সাদ। আজকাল হুট করেই মারা পড়ছে মানুষ। তার মত পঁচিশের যুবকও মৃত্যুর ভয়াবহতা ভোগ করছে। কখন কার মৃত্যু আসে কিচ্ছু বলা যায় না। মোবাইলটা চার্জে রেখে বাইরে বেরিয়ে এল সাদ। নিজাম চাচার বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। নিজাম চাচা দেখতে সাদের মতই। কম দামি পাঞ্জাবি আর সেই ধবধবে সফেদ টুপি। মাঝে মাঝে রাস্তায় মুখোমুখি হলে হাত তুলে সালাম দিতেই মুখম-লজুড়ে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, কেমন আছো, বাবা? নামাজ-কালাম পড় তো?

বাড়ির সামনে মোটামুটি একটা জটলা তৈরী হয়ে গেছে। নিজাম চাচার বন্ধু শাফায়াত আংকেল উপস্থিত লোকজনকে হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বলছেন। সাদ এগিয়ে গিয়ে জটলার পাশে দাঁড়াল। শাফায়াত আংকেলের দুচোখভরা অশ্রু। তিনি নিজেকে সংবরণ করে বললেন, এমন আল্লাহপ্রেমিক লোক ছিল সে আমি বুঝতেই পারি নাই। সবাই মাথা নিচু করে ফেলেছে। সম্ভবত সবার চোখেই পানি।

শাফায়াত আংকেলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সাদ। নিচু স্বরে জিজ্ঞে করল:

–           কী হয়েছিল, আংকেল?

প্রশ্নটা যেন আরও বিচলিত করে দিল শাফায়াত আংকেলকে। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সাদ। নিজেকে সংবরণ করে আংকেল বললেন:

– শেষরাতে তাহাজ্জুদে উঠছিল। তাহাজ্জুদ পড়ে কতক্ষণ জিকির করল। জিকির করতে করতে কী হলো, গজল গাইতে শুরু করল, ‘মাওলার এশকে জ্বলে আগুণ, নিভাইলেও সে নেভে না……, গজল শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কালিমায় শাহাদাত পড়ল। তারপর……..

শাফায়াত আংকেল আবারও ডুকরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। পুরো বাড়িজুড়ে কান্না ছেয়ে গেছে। একজন বলল, শাফায়াতের বউটাও বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। মায়ের কথাটা মনে পড়ল সাদের। ভয় হল, চাচী আবার মায়ের মত চলে যাবেন না তো? বাবার কথাও মনে পড়ছে তার এই মুহূর্তে। মনে পড়ছে, অসুস্থতার দিনগুলোতে বাবা প্রায়শই গুণগুণ করে গাইতেন ‘

অদেখা আল্লাহর ভালবাসায় কি এমন শক্তি আছে যে তা তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নেবে? যাকে দেখি নি তাকে এভাবে ভালবাসা যায়? এভাবে তাকে ভালবেসে জীবনের মায়া ত্যাগ করা যায়?

প্রশ্নরা মাথা ভারী করে তুলতে থাকে সাদের। আকাশে তারাদের নিষ্প্রভ উপস্থিতি তখনও আছে। ক্রমেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তজুড়ে। মৃদু বাতাস বইছে হালকা হীমছোঁয়া নিয়ে। দূরে কোথাও পাখির ডাক শোনা গেল মিষ্টিস্বরে। এক মুহূর্তের জন্য সাদের মনে হল, এতসব আয়োজন একজন মানুষের অভ্যর্থনার জন্য। তিনি প্রস্তুত হচ্ছেন নবতর যাত্রার জন্য। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল সাদ। এখনও কি ফজরের ওয়াক্ত বাকি আছে?

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট