হায়! যে জাতির তরুণ তুর্কিদের উচিত ছিল পশ্চাতপদতার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগা; জ্ঞান, দীক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে  দৃঢ় সংকল্প করে নিমগ্ন সাধনায় ব্রতী হওয়া; উন্নত ও সুসভ্য জাতিগঠনে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া ও লক্ষ্য পূরণে দুর্নিবার গতিতে এগিয়ে চলা, সেই তারুণ্যশক্তি আজ মত্ত হয়ে আছে পূর্ববর্তীদের দোষচর্চা, নিরর্থক সমালোচনা, উশৃংখল উসকানি আর অভব্যতা অনুশীলনে। যে জাতির ইলম ও আমল, জ্ঞান ও কর্মের ক্রমাগত অধঃগতি ও পতন উম্মাহর প্রতিটি জনপদকে ভীত, শংকিত ও নিরাশায় নিমজ্জিত করে রেখেছে, সে জাতির তরুণ যুবাদের জীবনের প্রধান কর্ম ও লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বড়দের সমালোচনা ও ঘৃণাচর্চায় নিজেকে উৎসর্গিত করা। অথচ, তাদের অজানা নয়, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর পূর্ববর্তীগণ বিগত শত বছর পূর্বে যা করে গেছেন তার সিকিভাগ হয় নি তাদের বসতিতে, উম্মাহর কল্যানে, জাতিগঠনে। যখন কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি সম্পর্কে নতুনভাবে কাজের অভিপ্রায়ে পূর্ণ উদ্যম নিয়ে, খামতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে ঝাপিয়ে পড়া উচিত ছিল, তখন তারা বাবা, দাদা, পরদাদাগণ কেন করেন নি বা কেন করছেন, করেছেন ইত্যাকার সময়হন্তারক ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়াদিতে নিজেদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। সত্য হলো, এই তরুণ যুবারাই এই সমাজের ক্রমঅধঃগতির মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃদ্ধ বাবাকে যুবক ছেলে গালাগাল দেয়, পুরো জীবন ক্ষয় করেও এই লোক কিছুই করেন নি তাদের জন্য। বাবাকে সে গালি দেয় অথর্ব, অপদার্থ, স্বার্থান্ধ, মুনাফিক ইত্যাকার অসভ্য ও অসামাজিক শব্দযোগে। ছেলে কি নিজেকে যোগ্য মনে করে? তার মত কাবিল ছেলেকে জন্ম দিতে পারা এবং যেমনতেমন করে হলেও পেলেপুষে বড় করতে পারা সেই অথর্ব বাবার সফলতা; নিঃসন্দেহে। কিন্তু ছেলে কি পারছে তার ছেলেকে, তার পরবর্তী প্রজন্মকে যোগ্য করে, কাবিল বানিয়ে বড় করে তুলতে? এই একটা প্রশ্নেই ছেলের মাথা নত হয়ে যাওয়ার কথা। বস্তুত, যে তরুণ যুবারা নিজেকে মগ্ন করেছে বাপ-দাদাদের সমালোচনায় তাদের বাতির নিচেরটা বেশ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত।  তারা যেমন পরবর্তী প্রজন্মকে যোগ্য করতে পারছে না, তেমনি পারছে না উম্মাহর চাহিদা মেটাতে, যুগের প্রয়োজন পূরণ করতে। উপরন্তু, প্রতি নিয়ত তারা জন্ম দিচ্ছে একটি অভব্য, বেয়াদপ, নির্লিপ্ত, অচেতন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যারা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম, আজকের যুবা প্রজন্মকে গালাগালি করবে, অবশ্যই করবে, আরও নিকৃষ্ট, জঘন্য, কুৎসিত শব্দ ও বাক্য যোগে। বাবাকে অপমান করে ছেলে যেমন পরিবারে উন্নয়ন আনতে পারে না, আকাবির ও বড়দের গালমন্দ করে আজকের যুবারা কস্মিনকালেও উম্মাহর অধঃপতন রোধ করতে পারবে না। কথাগুলো অপছন্দের হলেও সত্য এই তিতেটাই।

ফোনের ওপ্রান্ত থেকে যখন কেউ কথা বলে, অনেকে ভাবেন, কী এত সমস্যা তার, ব্যস্ততা তার যে ফোনটা ধরতে পারে না, কথা বলতে পারে না, ব্যস্ততা দেখায়। অথচ, সেই ব্যক্তি তখন, হতে পারে, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পার করছেন। হয়ত অতি গুরুত্ববহ কাজ তাকে অস্থির করে রেখেছে। বেতারের সংকট হলো, দৃষ্টির অগোচরে থাকা এই বাস্তবতা অনেকে উপলব্ধি করে না; করতে চায় না। সে মনে করে, আমি ব্যস্ত নই মানে দুনিয়া যাপন করছে এক সুশান্ত দীর্ঘ অবসর। চলছে পৃথিবীর সুন্দরতম অফপিক আওয়ার। অন্যকে বোঝার কোনো ব্যস্ততা, ব্যগ্রতা কিংবা দায়বদ্ধতা নেই তার। পূর্ববর্তীদের সাথে আমাদের যোগাযোগের হালচাল এই দুজন মুঠোফোন ব্যবহারকারীর মত হয়ে গেছে। ওপর প্রান্তের লোকটির প্রয়োজন, বিপদ বা সংকট বোঝার গরজ কারও নেই। যা আছে তাকে বলা যায় চপল উত্তেজনা। ঘটনার ঘনঘটা দেখে চপল হৃদয় অস্থির হয়ে ওঠে যতপরনাস্তি দ্রুততায় ব্রেকিং নিউজ পৌঁছে দিতে সবার দোরে দোরে, যারা আছে চেনা বা অচেনা বন্ধুকোটাজুড়ে। তৃষিত মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে দু-চারটে লাইক-কমেন্টের জলাহার করে ছাতিতে সাময়িক সুখদ অনুভব নিয়ে আরামের বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে প্রীতিময় শায়েখ, হজরত শব্দ শোনার তীব্র নেশায়। হায়! এই আরামের বিছানায় শোয়ার আগে সে যদি একবার স্মরণ করত সেসব উপল-বিদীর্ণ সময়ের কথা যখন সকাল-সন্ধ্যার ডালভাতের পরও আজকের বৃদ্ধ পিতা ফ্লোরে পাতা এককাথার শক্তবিছানায় শয্যাগত হতে হতে হৃদয়ে গোপন আকাংখার জাবর কাটছিলেন; বাবা বলে ছেলে নাম করবে! আজকের বাবাও কি তেমন সুপ্ত বাসনা নিয়েই আরামবিছানায় গা এলিয়ে দিচ্ছেন?

অধঃপতন নিয়ে সমালোচনা যারা করেন, আমি বলছি না এটা খারাপ বা অদরকারি, বলছি, উত্তরণের কোনো উদ্যোগ কি তাদের কথায়, কর্মে, আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে? উত্তরটা যদি হয় নঞর্থক তবে বলতে দ্বিধা নেই, লোকসানের পাল্লা ভারি করা ছাড়া এই তরুনসমাজের দ্বিতীয় কোনো পারঙ্গমতা নেই। বস্তুত, যারা সমাজবিনির্মাণ ও জাতিগঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চায় তাদের উচিত পূর্ববর্তীদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং অযথা শক্তিক্ষয় বন্ধ করে সময় ও সামর্থ্য উপযুক্ত স্থানে ব্যয় করে উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করা। আপনি ইমান, আমল, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল নিয়ে যখন প্রশ্ন তুলছেন তখন এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে আপনার এসব করা ও অর্জন করার যোগ্যতা ও সামর্থ্য আছে। আপনি এসবে পূর্ণতা বা নিদেনপক্ষে সমালোচিতের তুলনায় উন্নত হয়ে দেখান। আপনি সমাজনীতি, আচরণবিধি ও চারিত্রিক ত্রুটির সমালোচনা করছেন অর্থ এসব ত্রুটি থেকে আপনি মুক্ত বা মুক্ত হতে পারেন। তাহলে আপনি সেটা করে একটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করুন। কাজ করুন। তারপর সমালোচনা করুন। কাজ করা ছাড়া কেবল সমালোচনার জন্য যে সমালোচনা তাকে গঠনমূলক সমালোচনা বলে না। এবং এতে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি ছাড়া উপকার কিছু হয় না।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট