০৫ – ১২ – ১৪৪১ হি., সোমবার, ২৭ – ০৭ – ২০২০ ইং

এপেক্সে গিয়েছিলাম বুথ থেকে টাকা তুলতে। প্রথমবারের মত বুথ থেকে টাকা তোলার যাত্রা। সাদ ভাইয়ের পোস্ট দেখে রকেট একাউন্ট খুলেছিলাম ঘরে বসে, অ্যাপ থেকে। প্রথমবার একাউন্টে টাকা আনা হলো; অতি প্রয়োজনে। সেই টাকা হাতে পেতে ভর দুপুরে এপেক্স যাত্রা। দেড় মাস হয়ে গেছে বাসায় এসেছি। এই নিয়ে তৃতীয়বার বহির্যাত্রা।। এপেক্স পর্যন্ত পায়ে-হাঁটা পথ। অনেকদিন এই পথে পা পড়ে নি আমার। পরিচয়ে খানিকটা ভাটা পড়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে পথে শত-সহস্রবার আমি হেঁটে গেছি সেই পথ চিনে নেওয়া দুস্কর হওয়ার কথা না। একসময়, মাত্র এক যুগ আগে, ঘন জঙ্গল ছিল এখানে। পদপ্রান্তে অগুণতি লতাগুল্ম আর চারাগাছের ঝোপ নিয়ে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে থাকত গজারীর দল। বসন্তে গজারীর মাথা ছেয়ে যেত ‘চরকি ফুলে’। মোটা মোটা ছালওয়ালা লতা হলো গাছ-আষ্টেপৃষ্ঠে। লতার গোড়া কেটে দিলে ঝুলে পড়ত দীর্ঘ মোটা দড়ির মত। সেই লতায় ঝূলে ও ও ডাক দিয়ে চলত ‘টারজান খেলা।’

ডালে ডালে হলুদ মিষ্টি ফল নিয়ে কাটার গুঁতো খেতে আহ্বান করত ময়নাকাটা গাছ। কাটার ভয় থাকলেও বঙ্কইয়ের লোভ সামলানো ছিল দুর্দমনীয়। কিন্তু মন-কাটার কাছে কোনো লোভের প্রশ্রয় ছিল না। বুনোচালতা আর নাম-না-জানা অসংখ্য বনফুলের সুবাসিত ফুলেল পথে চলতে গিয়ে সতর্ক থাকতে হতো, মন-কাটা যাতে কাটা দিয়ে না বসে।

থেকে থেকে দেখা মিলত শেয়ালের ‘গুহা’র। দেখা হয়ে যেত পণ্ডিত গুহাবাসীদের সাথে। রাতজাগা ডাকাতের মত লাল চোখে চোখ রেখে সামনে এগোনোর কায়দা রপ্ত ছিল তখন। এখন নেই। এখন তো কিছু নেই। জঙ্গল উজাড় হয়ে গেছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত। মানববসতি আর গার্মেন্টস দখল করে নিয়েছে নির্ভেজাল সবুজের সমারোহ।

মনে পড়ে, এপেক্সের ঠিক পেছনে খাসজমিতে ঘর করেছিল জাহিদরা। ছোটখাট টঙ দোকান পেতেছিল মেঠো পথটার পাশে। আশেপাশে আর কোনো ঘরবাড়ি ছিল না। দোকান তো না-ই। সন্ধ্যা হলে নিরব হয়ে যেত চারদিক। ঘুটঘুটে অন্ধকারে গা ছমছমে ভুতুড়ে পরিবেশে পথ চলতে সাহস করত না কেউ। বিশাল তালগাছের নিচে ওদের বাড়ির সামনেই জমা হতো এপেক্সের ঝুট। ঝুটের ভেতর ফেলে দেওয়া দুএক প্যাঁচ সাদা কস্টেপ পাওয়া যেতো। পাওয়া যেত টুকরো চামড়া আর কালো কাপড়ের কাটা টেপ। টুকরো টুকরো পাতলা ফোমও পাওয়া যেত। এগুলো খুঁজে বের করতে আমরা ভুতুড়ে জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ওদের বাড়ি যেতাম। আবর্জনা খুঁজে যা মিলত ওগুলো জোড়া দিয়ে টেনিস বল বা আরেকটু বেশী পেলে ভেতরে ফোম ঢুকিয়ে বানিয়ে ফেলতাম তুলতুলে ফুটবল। তারপর চলত তুমুল বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। জাহিদদের বাড়িটা এখনও আছে কি না জানি না। ওদের টঙ দোকানটা চোখে পড়ে না। সেখানে এখন রীতিমত পাকা-পথ, ব্যস্ত মার্কেট, তুমুল জনকোলাহল।

*** দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার কথা বলে তো আর লাভ নেই। বুথের বাইরে নেট আছে, ভেতরে গেলে ‘সার্ভার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। অনেক্ষণ চেষ্টার পর ভাবলাম হেল্পলাইনে ফোন করে দেখি। ব্যালেন্সে পয়সা আছে; টাকা নেই। ফ্ল্যাক্সি-দোকান খুঁজতে বেরিয়ে মনে হলো, আগে জামাআতে নামাজটা সেরে আসা যাক। পাশেই এপেক্স মাদরাসা। মসজিদে যখন ঢুকেছি এক রাকাআত তখন শেষ। নামাজের সালাম ফেরাতেই মুহতামিম সাহেবের সাথে চোখাচোখি। স্মিত হেসে বললেন, কামরায় আসুন। বাড়িতে যেদিন এলাম, গাড়ি থেকে নামতেই তার সাথে দেখা। তাড়া ছিল বলে কথা বলা হয় নি তখন। তিনিও ব্যস্ত ছিলেন। তারপর তো প্রায় দেড়মাস ‘ঘরবাসী’ হয়ে আছি।

কথা হলো অনেকদিন পর। মানুষটিকে আমি চিনি অনেক বছর হলো। প্রায় পনের বছর। কিন্তু তিনি আমাকে চেনেন মাত্র কয়েকমাস। আমি তাকে চিনতাম দূর থেকে দেখে। সেই দর্শনও কেবল একবার হয়েছিল, পনের বছর আগে। মাস কয়েক আগে বাড়ির মসজিদ-মাদরাসার জন্য তার কাছে যেতে হলো। তখনই হলো আসল চেনাজানা। অথচ আমাদের বসবাসের দুরত্ব পায়ে-হাঁটা পথে মাত্র দশ মিনিট।

মুহতামিম সাহেব নবগঠিত ‘কালিয়াকৈর উপজেলা উলামা কল্যান পরিষদ’ নিয়ে খুব ব্যস্ত।  পরিষদের বর্তমান সভাপতি তিনি। আগে ছিলেন ‘কালিয়াকৈর উপজেলা উলামা পরিষদ’ –এর সিনিয়র সভাপতি। বেশকিছু জটিলতার কারণে পুরনো পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুনটা করতে হয়েছে। কিছু বেদনার কথা বললেন। কিছু স্বপ্নভঙ্গের কথা শোনালেন। এবং বেশ অস্বস্তিভরে কিছু ক্ষোভের কথাও বলে ফেললেন। মানুষ যখন বড় আশা করে কিছু করে এবং সেই আশা ভেঙে যায়, অনেকে উদ্যম হারিয়ে ফেলে। তাকে দেখে মনে হলো, উদ্যম তিনি হারান নি। কামরায় তখন কথাসঙ্গী ছিলেন পরিষদের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল, সফিপুর বাজার মসজিদের প্রাক্তন ইমাম ও খতিব মাওলানা উসমান সাহেব। বর্ষীয়ান আলিম। আমাদের এলাকার প্রধান মসজিদের প্রতিষ্ঠার গল্প শোনালেন। শোনালেন মাটির নিচ থেকে বস্তা বস্তা ছোলাবুট বেরিয়ে আসার গল্প। গল্পের মাঝপথে হাকডাক করতে করতে হাজির হলেন আসাদুল্লাহ বাবু। স্থানীয় বিএনপির নেতা। বাবু মাদরাসাটির সাথে এমনভাবে মিশে আছেন, লোকে বলে, এটা বাবুর মাদরাসা। আগে কখনও দেখি নি তাকে। প্রথমবার দেখে মনে হলো, সজ্জন হবেন হয়ত।

দুপুরে খাওয়া হলো মাদরাসাতে। একজন মুফতি সাহেব খাওয়ার আয়োজন করেছেন। আহারকক্ষ দেখে মনে হলো, সম্ভবত অফিস। অফিসে ঢুকে চেনাজানা একজনের ওপর চোখ পড়ল। বাইপাইলের আলামিনে বা আশরাফিয়াতে তাকে দেখেছি আমি। একই মাদরাসায় পড়তাম আমরা। চেনা মনে হওয়াতেই তাকে ‘কেমন আছো’ বলে ফেললাম। পড়ে ভেবে দেখেছি, এভাবে তুমি সম্বোধন সম্ভবত অচেনা পরিবেশে সৃষ্ট অস্বস্তি দূর করা জন্যই করেছিলাম। মানুষের অস্বস্তি দূর করার জন্য স্বভাববিরুদ্ধ কতকিছুই তো করে ফেলে। বললাম, কতদিন হলো এখানে আছো? বললো, পাঁচ বছর। একটু লজ্জা লাগল বোধহয়। পাঁচ বছর বাড়ির পাশের মাদরাসাতে সে পড়ায় আর আমি জানছি এখন। মুরগির গোশত দিয়ে ভাত খেতে খেতে আরও জানা হলো, এই মাদরাসার প্রথমযুগের ছাত্র সে এবং বাড়িটাও তার অনতিদূরে। কী লজ্জার কথা!

**** খাওয়া-দাওয়া আর হালকা গল্পগুজব শেষে ছাড়পত্র মিলল বিদায়গ্রহণের। টাকা তুলতে আবার বুথে গেলাম। রাস্তায় তখনও সাড়িসাড়ি যানবাহন, একটু এগিয়ে যাবার সুযোগের অপেক্ষায়। গতকাল এইখানে দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলন করেছে শ্রমিকরা। পুলিশি ‘শৃংখলা রক্ষা’ও সম্পন্ন হয়েছে এই পথে। উত্তপ্ত শ্রমিকজনতার ইট-পাটকেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাড়ি, মারা গেছে দুটো কুরবানির গরু। সেই থেকে রাস্তায় বসে আছে গাড়িগুলো। বুথে তখন লোকজনের ভিড়। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে টাকা তুলতে গিয়ে দেখি এটিএম বলছে ‘আপনি সর্বোচ্চ উত্তোলনের সীমা পার করে ফেলেছেন।’ বলে কী? টাকা মোটে তুলতে পারি নি; সীমা পার হয়ে গেছে? হেল্পলাইনে ফোন করলাম ঘটনা বোঝার জন্য। পুরো সাত মিনিট ধরে মিনিটে সাড়ে তিন টাকা দিয়ে নেক্সাস পে আর হেনতেন শোনার পর সুযোগ মিলল কাস্টমার প্রতিনিধির সাথে কথা বলার। সে অপেক্ষা করেন বলেন পুরো দেড় মিনিট, আল্লাহ জানে, কী কী চেক করে দেখল। তারপর শোনালো, স্যার, আপনার একাউন্ট অথরাইজড হয় নি। এই একাউন্ট থেকে আপনি মোবাইল রিচার্জ করতে পারবেন; টাকা উত্তোলন বা লেনদেন করতে পারবেন না। আপনি চাইলে অ্যাপ দিয়ে চেষ্টা করতে পারেন। যদি না হয় তাহলে কাগজপত্র জমা করে দিলে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যেই অথরাইজড হয়ে যাবে। মাথায় উপর তখন ‘আইক্কাওয়ালা বাঁশ’। ভগ্ন মনোরথে, রিক্ত হাতে, ঘর্মসিক্ত বদনে ফিরে এলাম ঘরে, পনের মিনিটের দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পরে।

***** বাসায় এসে জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমেই অথরাইজড করা গেল, আধামিনিটের ভেতর। তারপর আবার সেই দীর্ঘ যাত্রা, বাজার-সদাই এবং গৃহকোণে ফিরে আসা। অনেকদিন পর দীর্ঘ পদভ্রমণে মনে হলো, পায়ের তলায় ফোঁসকা পড়ে গেছে। পা টেনে টেনে সামনে এগোবার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি কষ্ট ভুলে অন্যকিছু ভাবতে। পথ চলতে চলতে ভাবি, একদিন তো ফিরতে হবে এই পথে। বিলীয়মান বনের ভেতর ক্লান্ত সাপের মত একেবেঁকে পড়ে থাকা সবুজ শ্যাওলাঢাকা এই কর্দমাক্ত পথে। তখন কি আসলেই অবশিষ্ট থাকবে এই নিরাভরণ বনানী? বাকি থাকবে মেঠো পথের সোঁদা গন্ধ? শৈশব বুকে চেপে রাখা এইসব লাল মাটির পিচ্ছিল রাস্তা? নাকি বিলীন হয়ে যাবে অপসৃত কৈশোরের মত? আমার সন্তান কি বিশ্বাস করবে, এই পথজুড়ে ছিল অসংখ্য কাটাগাছ, লতাগুল্ম, শেয়ালের গর্ত আর টিলাসদৃশ উঁইয়ের ঢিবি? কনকনে শীতের রাতে সে কি শুনতে পাবে শেয়ালের হুক্কাহুয়া? অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর অক্লান্ত গান্ধার শুনে ঘুম কি ভাঙবে তার? সে কি জানবে এইখানে সদর্পে ঘুরে বেড়াতো গলাউঁচু গুঁইসাপ, ত্রস্তপদী বেজি এবং অনিন্দ্য সুন্দর ঘুঘু? পথ ফুরিয়ে আসে। ফুরিয়ে আসে বেলা। ধুসর হয়ে আসে সবুজের বুকে আাঁকা একটি জীবনের স্থিরচিত্র।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট