বইপাঠ – ৩
বই : ইসলাম ও মুক্তচিন্তা
ধরণ : ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডন
লেখক : মুহাম্মাদ আফসার উদ্দীন
প্রকাশক : নাশাত পাবলিকেশান্স
প্রকাশকাল : জানুয়ারি ২০২০, জুমাদাল উখরা ১৪৪১ (প্রথম সংস্করণ)
মুদ্রিত মূল্য : ১৭০ টাকা।
ফ্রি জিনিস যে ভাল হয় না, কমবেশী সবাই আমার এই কথা জানি। জানার পরও কোনো এক অমোঘ কারণে ফ্রি জিনিসের প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকে তুমুল। বাঙালি জীবনে এই তুমুলতা বা প্রচণ্ডতা অন্য সকল জাতি-গোষ্ঠীর চেয়ে বেশী। ফলে বাঙালির জন্য প্রবাদ দাঁড়িয়ে গেছে, ‘বাঙালি ফ্রি পেলে আলকাতরাও খায়।’
উপরের কথাটুকু আসলে অপ্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক কেবল এই দৃষ্টিতে যে, যে বিষয়ের ওপর সদ্য পঠিত বইটি রচিত, সেটার ইংরেজি নাম ‘ফ্রি-থট’। বাংলায় শব্দটার অর্থ করা হয়েছে, মুক্তচিন্তা। একইভাবে ফ্রি-মাইন্ডের অর্থ করা হয় মুক্তমনা। দুটো শব্দের শুরুতেই ফ্রি থাকায় ফ্রির কথাটা চলে এলো। অবশ্য এই ফ্রি জিনিস দুটোও মূলত ভাল জিনিস না। এটাও একটা মিল।
মুক্তচিন্তা আসলে কী? মুক্তচিন্তার প্রাথমিক পাঠকের সামনে এই প্রশ্নটি সহজেই উঠে আসতে পারে। বিশেষত, ইংরেজি শব্দের বাংলায়ন ও পারিভাষিক অর্থ বাদ দিয়ে শাব্দিক অর্থে ব্যাখ্যার যে অপসংস্কৃতি চর্চিত হচ্ছে সাম্প্রতিককালে, একজন বোদ্ধা পাঠকও তাই জেনে নিতে চাইতে পারেন, লেখক কী অর্থে ব্যবহার করবেন এই পরিভাষাটিকে? পাঠকের অনুসন্ধিৎসা ও প্রাথমিক পাঠকের প্রয়োজনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখক বইয়ের সূচনা করেছেন ফ্রিথট বা মুক্তচিন্তার পরিচয় দিয়ে। মুক্তচিন্তার ইতিহাস, সংজ্ঞা ও শরয়ি হুকুম আলোচনার মাধ্যমে তিনি সাজিয়েছেন বইয়ের ‘প্রাকালাপ’। পরবর্তী আলোচনায় প্রবেশের জন্য প্রাকালাপটি ছিল অতি সুন্দর পরিপাটি প্রবেশদ্বার। প্রবেশের আগেই পাঠক নিশ্চিত হয়ে যান, মুক্তচিন্তা বলে যা গেলানোর পায়তারা চলছে তা আসলে উপাদেয় কিছু না।
অতপর, লেখক মূল আলোচনায় নেমেছেন। লেখকের ভুমিকা থেকে আমরা আগেই জানতে পেরেছিলাম, ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিকের ‘রাসুল সা. ও মুক্তচিন্তা’ শিরোনামে রচিত প্রবন্ধের খণ্ডনে বইটি রচিত হয়েছে। এককভাবে সিদ্দিককে খণ্ডন লেখকের উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু তার প্রবন্ধটিতে মুক্তচিন্তার পক্ষে কুরআনুল কারিমের সাঁইত্রিশটি আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে এবং কুরআন থেকে মুক্তচিন্তার পক্ষে দেওয়া প্রায় সবগুলো দলিল সন্নিবেশিত হয়েছে তাই সেটিকে সামনে রেখেই লেখক মুক্তচিন্তার মত একটি ভ্রান্ত মতবাদের; বরং কুফরি মতবাদের খণ্ডন করতে বসেছেন। ১৪৩ পৃষ্ঠার ছোট্ট কলেবরে লেখক কুরআনুল কারিমের সেই সাঁইত্রিশটি আয়াতের সঠিক মর্ম ও তাফসির উল্লেখ করেছেন উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম মুফাসসিরদের ভাষ্য, ব্যাখ্যা ও সমাধানের আলোকে। অধ্যায় সংযুক্ত করেছেন একুশটি।
প্রতিটি খণ্ডনের আগে লেখক প্রবন্ধকারের কথা উদ্ধৃত করেছেন। প্রবন্ধে উল্লিখিত আয়াত ও সে সম্পর্কিত প্রবন্ধকারের বক্তব্য তুলে দিয়েছেন। মূল প্রবন্ধ পড়তে না পারলেও উদ্ধৃত অংশ থেকে আমরা বুঝতে পারি, প্রবন্ধকারের ভাষাজ্ঞান বেশ ঋদ্ধ। লেখার সাহিত্যমানও বেশ উন্নত। কিন্তু দীনতা তার মূল জায়গাতে; দীনের মৌলিক চিন্তার জায়গাতে। উদ্ধৃত অংশগুলো পাঠে ধারণা তৈরী হয়, একজন সচেতন পাঠকের সামনে যদি উপস্থাপন করা হয় এই প্রবন্ধ, নিঃসন্দেহে তিনি বুঝে ফেলবেন, প্রবন্ধকার গোজামিল দেওয়ার চেষ্টায় ব্রতী থেকেছেন পুরো প্রবন্ধজুড়ে। খুবই সংক্ষিপ্ত একটি প্রবন্ধের ছোট্ট সীমানায় তিনি বেশ কয়েকবার স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। তার প্রমাণপদ্ধতি (ইস্তিদলাল) অত্যন্ত দুর্বল, ধোপে টেকার মত না। ইতিপূর্বে প্রবন্ধকারের ‘হারাম ছবি’ বিষয়ক একটি প্রবন্ধ পাঠের সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানেও তিনি জুমহুর উলামায়ে কেরামের বিপরীতে গিয়ে মত প্রকাশ করেছিলেন।
লেখক আফসারুদ্দীন বেশ সমৃদ্ধ বয়ানের মাধ্যমে মুক্তচিন্তার প্রমাণপঞ্জিকে তুলোধুনো করেছেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় দেওয়া প্রবন্ধকারের ব্যক্তিগত ‘তাফসিরের’ বিপরীতে প্রতিটি আয়াতের শুদ্ধ, সঠিক ও গ্রহণযোগ্য তাফসির তুলে ধরেছন উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম মুফাসসিরদের গ্রন্থাদি থেকে। প্রমাণকে জোরদার করার জন্য একের পর এক তাফসিরের বরাত দিয়ে গেছেন। এবং বেশ সফলভাবে তিনি প্রমাণ করেছেন, রাসুলকে মুক্তচিন্তক বলা ও ইসলামকে মুক্তচিন্তার প্রথম অধিকারদাতা বলা নিরেট বিভ্রান্তি। মুসলিম দাবিদার ব্যক্তি কখনোই প্রচলিত মুক্তচিন্তক হতে পারে না। এবং একটি পরিভাষাকে শাব্দিক অর্থের ধুঁয়া তুলে জায়েজ করার প্রবণতা ইসলাম ধ্বংসের নামান্তর।
বইটির ভুমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক ইফতিখার সিফাত। তার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভুমিকাটি পাঠকের আগ্রহের বিশেষ কারণ হতে পারে।
ভালোলাগা
বইটিতে ভালো লাগার মত বিষয় অপ্রতুল নয়। বিশেষত, লেখকের ভাষার ওজস্বিতা, শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা এবং বাক্যগঠনে সরলতা সাধারণমানের পাঠকের জন্যও বেশ সুখপাঠ্যতার অনুভব তৈরী করে দেয়। আমি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করেছি, খণ্ডন করতে গিয়ে তীব্র আক্রমণের সুযোগ পেয়েও তিনি ন্যুনতম কঠোর শব্দ ব্যবহার করেন নি; সচরাচর যা চোখে পড়ে না। বিপরীতে অত্যন্ত ভদ্রভাবে সালাফের কথামালা আরবি মতন (মূলপাঠ) ও বাংলা অনুবাদ সহ উল্লেখ করেছেন। কুরআন কারিমের আয়াত উল্লেখ করার ক্ষেত্রে কেবল অনুবাদের ওপর নির্ভর করেন নি; ইদানিং যা প্রায় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থসমূহ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। ফতোয়া বিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রে পরিস্কার লিখে দিয়েছেন ‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফিকহের কিতাবাদিতে এর আলোচনা আছে। সেখানে দেখা যেতে পারে।’ কিন্তু প্রয়োজনানুযায়ী তাফসির ও তৎসংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উল্লেখ করতে কসুর করেন নি। বইটি সাজিয়েছেন উদ্ধৃতি ও পর্যালোচনা শিরোনামে। মোট অধ্যায় এসেছে একুশটি। এবং বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন লেখক নিজেই!
মন্দলাগা
মন্দলাগার মত বিষয় খুব কম। যেমন : লেখকের পরিচয় জানার জন্য বইটি উল্টেপাল্টে বেশ কয়েকবার দেখেছি। লেখকের কোনো পরিচিতি সংযোজিত হয় নি। সম্পাদকের ভুমিকা থেকে জানতে পেরেছি লেখক একজন মাওলানা। অথচ, এরকম বইয়ের ক্ষেত্রে লেখকের পরিচয় থাকা বেশ জরুরি।
আরবি পাঠগুলোর টাইপে বেশ ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে টাইপিং মিসটেক। বিষয়টাতে নজর দেওয়া দরকার। আমার মত অনেক পাঠকই হয়ত আছেন যারা বাংলা অনুবাদ খুব কমই পাঠ করে থাকেন। চেষ্টা করেন আরবি উদ্ধৃতি দিয়ে পড়া শেষ করতে। তাদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর বিষয়টি।
কিছু জায়গাতে মনে হয়েছে দলিল হিসেবে উদ্ধৃতি আরও কম হলেও পারত। বিষয়টা এতোই সাদা যে এক-দুটো উদ্ধৃতির পর আর দরকার ছিল না। কিন্তু লেখক আরও বেশ কয়েকটা উদ্ধৃতি সেখানে সংযুক্ত করেছেন। যদিও এই প্রবণতা খারাপ নয় এবং এটাকে নিয়ন্ত্রন করা বেশ কঠিন; কিন্তু পরিমিতি বোধ সব জায়গাতেই উত্তম।
যদিও লেখকের ভাষা বেশ ভারী এবং শব্দ বেশ সতর্ক তবু লেখায় কিছু নতুনত্বের ছাপ আছে। বিশেষত প্রাবন্ধিক ভাষায় আরও বেশী সমৃদ্ধশালী হওয়া দরকারি। তবে, প্রথম লেখায় তিনি যে সম্ভাবনার ছাপ রেখেছেন, আগামী দিনে নিঃসন্দেহে একজন ঋদ্ধ প্রাবন্ধিক, লেখক আমরা পেতে পারি।
পরিশেষে, অনেকদিন পর একটা বেশ দারুণ লেখা পড়লাম। বাংলাভাষায় ইদানিং প্রচুর ইসলামি লেখা আসছে। এমন সোনালী মুহূর্তে এমন সমৃদ্ধ ইলমি লেখা আমাদের হৃদয়ের কামনা। আশা করছি, বইটি পাঠকের প্রচুর সমাদর পাবে এবং লেখক ইলমি পরিমণ্ডলে আদৃত হবেন।
পুনশ্চ : বইটির কথা আমাকে প্রথম বলেছেন প্রিয় লেখক, অনুবাদক ও ভ্রমণপিয়াসী কাজি আবুল কালাম সিদ্দিক (কাজী দা)। তার ভূয়সী প্রশংসার কারনেই বইটি পড়তে আগ্রহী হয়েছিলাম। বইপাঠ সমাপ্তির এই সুন্দর মুহূর্তে তার প্রতি রইল মনমুকুরের সুবাসিত ভালবাসা। আল্লাহ তার সকল খিদমত কবুল করুন।