গল্পটা আরবের সেই জাহিলি যুগের। গল্পের নায়ক মাআদ ইবনু আদনান গোত্রের। এজন্যই তাকে মুয়িদি বলা হতো। নাম ছিল জামরা ইবনু শাক্কাহ। শৌর্যবীর্য আর বাহাদুরিতে ছিল আরবের নামজাদা পালোয়ান। সাহস এতো বেশী ছিল যে, লাখমি সম্প্রদায়ের রাজা নুমান ইবনু মুনজিরের গবাদি পশুর ওপর হামলা করে বসে সে। রাজার পশু গোয়ালে তুলে বেশ আরামে দিন পার করতে থাকে।
ইরাকের দজলা নদীর ডান তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচুর্যময় শহর ‘নুমানিয়া’ রাজা নুমান ইবনু মুনজিরের [১] সৃষ্টি। ইসলাম আগমণের আগেই তিনি এই মহান কীর্তি স্থাপন করেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, রাজা হিসেবে ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপধর। সেই রাজার সম্পদে হামলা! রাজার পাইক-পেয়াদা ছুটল আদেশ পাবার সাথে সাথে। রাজদরবারে ধরে আনা হলো জামরা মুয়িদিকে। কিন্তু এ কি! রাজা ভেবেছিলেন, এমন কাজ যে করেছে, নিঃসন্দেহে বিরাট বাহাদুর আর পালোয়ান সে। দেখতে নিশ্চয়ই ভীমদর্শন। চেহারা দেখলেই কলজে শুকিয়ে যায় ভীতু লোকের। চেহারায় ঝুলে আছে শক্তিমত্তার জেল্লা। কিন্তু এ্যাঁ! একে তো দেখে গোবেচারা রাখাল বৈ মনে হচ্ছে না। রাজা বেশ হতাশ হলেন এমন ‘বীরদর্শনে’। আক্ষেপ করে বললেন :
تسمع بالمعيدي خيرٌ من أن تراه
‘মুয়িদিকে দেখার চেয়ে তাকে শোনাই ছিল ভাল।’ [২]


শৈশবের সহপাঠী খালিদ। একসাথে হিফজবিভাগের কয়েকটা মাস কেটেছে আমাদের। পাশাপাশি শুতাম আমরা। বেশ চটপটে আর বুদ্ধিমান ছিল। আবারও আমাদের সাক্ষাত হয় প্রায় দেড় যুগ পর; তখন বেশ বড় আমরা। চপলতা হারিয়ে গেছে খালিদের; বুদ্ধিটা শানিত হয়েছে আরও। গল্পে গল্পে উঠে এলো সমকালীন শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুহাদ্দিস মুফতি আবদুল মালিক সাহেবের কথা। কিছুটা হতাশা নিয়ে সে জানালো, ‘অনেক আশা আর কল্পনা নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম তাকে। একদম হতাশ। বেটে। কালো। অসুন্দর একটা মানুষ। দেখে ভাল লাগার উপায় নেই।’ আমার তখন মুয়িদির কথাটা মনে পড়ল। সেই জাহিলি যুগ থেকে আরবরা এমন পরিস্থিতিতে মুয়িদির কথা মনে করে। মুয়িদিদর্শন তাদের সাহিত্যে এক মর্যাদাপূর্ণ প্রবাদ। যোগ্য লোকের মুখদর্শনে হতাশ হলে তারা অকপটে বলে :
تسمع بالمعيدي خيرٌ من أن تراه


আবদুল মালিক সাহেবকে দেখার অত্যুগ্র আগ্রহ ছিল আমার। স্বভাবআলস্য বাদ দিতে পারলে সর্বপ্রথম হয়ত তাঁর ডেরায় যাওয়ার চেষ্টা চালাতাম। সেটা হয় নি ছাত্রজীবনে। উস্তাদজীবনে আমি অনেককিছু লাভ করছি, আল্লাহর দয়ায়, যা আগে কল্পনা করা ছিল গরিবের ঘোড়ারোগের দৃষ্টান্ত। রবের অনুগ্রহে একদিন দেখা হলো আবদুল মালিক সাহেবের সাথে। জামিআয় তার আগমণ আমার নসিব খুলে দিল। তাকে দেখলাম, তাকে শুনলাম। সামনে হাঁটুমুড়ে বসে থাকলাম দীর্ঘ সময়। কিন্তু মুখদর্শনের এই দীর্ঘ সময়ে একবারও মনে হয় নি, তিনি সুন্দর নন। একবারও মনে হয় নি তিনি লম্বা নন, তিনি ফর্সা নন। বারবারই মনে হয়েছে তিনি এমন একজন যার সামনে এসবের আলোচনাই বাতুলতা। মনে হয়েছে, সৌন্দর্যের যে বিভা তিনি ধারণ করে আছেন তাকে উপেক্ষা করে অন্যকিছু দেখা অন্তত আমার পক্ষে অসম্ভব। তিনি সুন্দর। চোখ ঝলসে দেওয়ার মত তাঁর রূপ। তুমুল মুগ্ধতা নিয়েই কেবল তাকে দেখতে হয়।


মুয়িদির কথা আমার মনে পড়ে। মনে পড়ে আবদুল মালিক সাহেবের কথা। আমার কথাও আমি ভুলতে পারি না। মুয়িদি হওয়ার যে গর্ব, আমি যদি সেটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারতাম।

তথ্যসুত্র

১. কারও কারও মতে নুমান তার উপাধি। লাখমি সম্প্রদায়ের তৎকালীন রাজাদের নুমান উপাধি দেওয়া হতো। জাওহারির তাঁর সিহাহ গ্রন্থে আবু উবাদাহর বরাতে মতটি উল্লেখ করেন। কিন্তু মতটিকে শক্তিশালী মনে হয় না। তার পূর্ববর্তী কোনো রাজার উপাধি নুমান ছিল বলে জানা যায় না। নুমান ইবনু মুনজির ইবনু মুনজির ইবনু ইমরাউল কায়েস লাখমি ৫৮২ থেকে ৬০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র সাতাশ বছর বেঁচে ছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের রোষানলে পড়েছিলেন তিনি। বোনকে বিবাহ দিতে অস্বীকৃতি জানানোই তার জীবনসায়াহ্নকে ত্বরান্বিত করে। পারভেজ তাকে জেলে বন্দি করে হত্যা করে। তার মৃত্যুর পর ছেলে মুনজির সাম্রাজ্য রক্ষার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা করতে পারে নি। সাম্রাজ্যের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছিল।

২. পরে অবশ্য কেবল তার বীরত্ব না; তার জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও প্রতুৎপন্নমতিত্ত্ব দেখে ভুল ভাঙে রাজার। তিনি স্বীকার করেন, সত্যিই সে যোগ্য ব্যক্তি। আরও বেশ অনেকগুলো গল্প আছে এই প্রবাদকে ঘিরে। প্রতিটি গল্পই বেশ উপভোগ্য। এবং সবগুলোর মূলকথা একটাই। অধিক প্রচলিতটাই এখানে আলোচিত হলো।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট