দূরে একটা খেজুর গাছ দেখা যাচ্ছে। খরস্রোতা নদীর তীব্র স্রোতের বিপরীতে দৃঢ় প্রতিবাদের নিশান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ আর উদ্ধত বৃক্ষের মত লাগছে গাছটাকে। ঝলসানো বালুসমুদ্রের ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে ক্ষীণকায় দুজন উটারোহীর যে ছোট দুটি ছায়া দেখা যাচ্ছে তার গতি ক্রমশ স্লথ হয়ে আসছে। তৃষ্ণা, অবসাদ ও ক্লান্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করে পেছনের আরোহী গলা চড়াল:
আবু মুআজ, চিঠিটা পড়ার জন্য হলেও তোমার একবার থামা উচিত। ভাষাটা বিদেশী না হলে আমি অবশ্যই পড়ে নিতাম। কে জানে, কোনো গুপ্তচর ভুল করে ফেলে গেছে কি না?
নিতান্ত ফালতু ছুতা। এটা ঠিক যে, সঙ্গীর ওপর বড্ড জুলুম করা হয়ে যাচ্ছে। সূর্য উঠতেই পথে নেমেছিল তারা। সীমাহীন বালুর সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছে। গ্রীষ্মের এই দাবদাহে যেখানে একটানা তিন মাইল চলাই দায় সেখানে আট মাইল উট দাবড়েছে বিনা বিশ্রামে। কেবল চিঠিটা তুলে নিতে মুহূর্তখানেক থেমেছিল। এমন ইমেজ তৈরী করে নিলে আগামীতে সঙ্গী জোগাড় সহজ হবে না।
‘ঠিক আছে, ওই খেজুর গাছটার গোড়ায় থামব আমরা। কিন্তু, ভুলে যেও না; অতি দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে আমাদের। নচেৎ পুরো ব্যাপারটাই কেঁচে গণ্ডুষ হবে। আমি চাই না, আবু মুআজের সাথে সাথে আবু আতিফেরও বদনাম হোক।’
খেজুর গাছের কাছে পৌঁছুতেই উট থেকে লাফিয়ে পড়ল আবু আতিফ। কোমরে বাঁধা মশক উপুড় করে দিল হা করে। কা- দেখে হো হো করে উঠল আবু মুআজ।
‘এতো তাড়াহুড়া করো না। গলায় আটকে গেলে বাঁচতে পারব বলে মনে হয় না।’
কোমরে বাঁধা মশক থেকে পানি পান করে পুটলি থেকে চিঠিটা আলগোছে বের করে নিল। বেশ শক্ত আর রঙিন কাগজে লেখা চিঠি। নীল কালিতে লেখা চিঠির ভাষাটা বাংলা। হাতের লেখা বেশ খারাপ। অনেক কসরত করেও হস্তাক্ষর সুন্দরের কাছাকাছি স্তরে পৌঁছাতে পারে নি লিখিয়ে। দেখা যাক কী আছে চিঠিতে।
22 – 1 – 2019 Bs 22 – 1 – 2019 22-1-2019م
……..
সম্বোধনের স্থানে এতগুলো ডট দেখে নিশ্চয়ই ধন্দে পড়ে গেছো। ভাবছ, পড়তে পড়তে জামাইটার মাথা ‘আউলায়া’ গেল নাকি? ওকে, আগে তাহলে ডটের ব্যাখ্যাই হোক। নাকি বিরক্ত হচ্ছো? ভাবছ, মিষ্টি মিষ্টি সম্বোধন তো করেই নাই; আবার শুরু করেছে তেলেনা ভাজা? তুমি নিশ্চয়ই আশা করো না, আমার নিবেদনগুলো অন্যদের মত সিম্পল হোক? সেজন্যই এইসব ভাজাপোড়া করতে হয়। যাইহোক, ডটের ব্যাপারটা বলি, অনেকক্ষণ ভাবলাম কী লিখে সম্বোধন করা যায়? বেশী ভাবলে আর বেশী দেখলে যা হয়; ঠাহর করা যায় না। তোমাকে যেসব সম্বোধনে আমি ডাকি সেসব অন্য কারও সমুখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়; তুমিও জানো। অন্য কারও কথাটা কেন এলো? কারণ, এই চিঠি আমি তোমাকে দিচ্ছি না। চিঠিটা আমি টাইম মেশিনে সেট করে ছেড়ে দেব অতীতের দিকে। চিঠির শুরুতে তাই ছোট্ট করে বাংলা, ইংরেজি ও আরবিতে তারিখ লিখে দিয়েছি। অতীতের কোনো ব্যক্তির হাতে যদি চিঠিটা পড়ে, এবং সৌভাগ্যবশত সে যদি এটা পড়তে পারে, একটা হুলুস্থুল বেধে যাবে নিশ্চিত। নিমিষেই পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়বে এই চিঠির কথা। তারপর যখন আমাদের কাল আসবে তখন চিঠি ও তার বিখ্যাত হওয়ার গল্প তোমার অজানা থাকবে না। আশা করি সেটা হবে আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য গ্রেট সারপ্রাইজ। সহসা মনে হল, কয়েকটা ডট বসিয়ে দিই। তারপর ডটের ব্যাখ্যার ছলে তোমার প্রতি আমার আবেগের কথা ও আমাদের সম্পর্কের কথাটাও বলে দিই কায়দা করে। তোমার কাছে প্রথম যেদিন এই চিঠির বার্তা পৌঁছুবে সেদিনই তুমি জেনে যাবে, শতবর্ষ যাবত জনৈক প্রেমিক তোমার প্রতীক্ষায় তীর্থের কাক হয়ে আছে।
পরসংবাদ, গতকাল এসএমসির পক্ষ থেকে দেওয়া ‘টেস্ট মি’র আরও কিছু প্যাকেট পেয়েছি। আগের সবগুলো ছিল অরেঞ্জ ফ্লেভারের। এবারের সবগুলো ম্যাংগো। সাথে ফ্রিতে চিনির ‘মিক্সার’। গোলাচ্ছি আর ঢকঢক করে গিলছি। আহ! লোকজন ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের জন্য’ যদি এমন ফ্রিতে অন্যান্য পণ্যও বিতরণ করত। যাইহোক, অতি লোভে তাতি নষ্ট বলে যে কথাটা আছে, সেটার সত্যতা এখনও পাই নি। পেলে তোমাকে আরেকটা চিঠি লেখব। সেই চিঠির বর্ণনা বেশ মজার হবে। অবশ্য চিঠিটা অতীতে পাঠানো যাবে না। ইজ্জত থাকবে না। শতবর্ষ পূর্ব থেকে লোকজন আমার চিঠি আর তাতি নষ্টের কাহিনী নিয়ে হাসাহাসি করছে ব্যাপারটা ভাল লাগছে না।
একজন ইনবক্স করেছে তার জন্য পাত্রী খুঁজে দিতে। আরেকজন ইনবক্স করেছে তার আত্মীয়ার জন্য পাত্র খুঁজে দিতে। দুটো মেসেজ পাওয়ার পর থেকে নিজেকে ‘ঘটক পাখি ভাই’ মনে হচ্ছে। পাত্রী সন্ধানীকে বললাম, আমার গাড়িতে তিন সিট খালি। ব্যাপারটা ভেবে দেখতে পারেন। সে গোস্বা হল কি না জানি না; আমার শ্বশুরালয়ের ঠিকানা চাইল। আমার বাড়ি বাদ দিয়ে শ্বশুরের বাড়ির ঠিকানা কেন চাইল বোঝার আগেই ঘটাং শব্দে তার হুমকিবার্তা, ‘বাড়িত জানলে ….. কাইট্টা দিব।’ মেসেজটা পড়ার পর থেকে ভয়ে আছি। চিঠিটা তোমার হাতে পড়বে না; এটাই যা ভরসা।
জীবনে যে কয়েকটা উত্তম কাজ করেছি তন্মধ্যে অন্যতম হল তোমাকে বিয়ে করা। বিয়ে করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ভাবছিলাম, জীবনটা কবর দিতে যাচ্ছি। স্বাধীন সোনার পাখিটা খাচায় বন্দী হতে যাচ্ছে। বেশ তো ছিলাম নির্ভার, নির্ঝঞ্ঝাট। কী দরকার ছিল! ‘এটা তো খুবই সম্ভব যে তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে করো, অথচ সেটা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত-২১৬)
বিয়ের পর প্রথম প্রহরেই মনে হল, জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি আমি। একটা উন্মূল, অস্থির, জাযাবর জীবন পরিত্যাগ করে গ্রহণ করেছি সুস্থির, সুশৃংখল, সুনিশ্চিত জীবন। গতকালও আমার কোনো গন্তব্য ছিল না; আমি খুঁজে পেয়েছি গন্তব্যের দ্বার। আমার ছিল না প্রশান্তির স্থল; না চাইতেই সেই মহার্ঘ নৈবেদ্য আমি লাভ করেছি। দুটো নির্ঘুম, ফোলা ফোলা চোখের স্বপ্ন দেখে কত রাত ভোর হয়েছে, আমার সংকটকালে অশ্রুসজল হয়ে যে অভ্যর্থনা জানাবে উষ্ণ আলিঙ্গনে। হাইজ্যাকারের হাতে পড়ার সেই রাতে আমি যখন ফিরলাম এবং তোমার সামনে দাঁড়ালাম….। একটি যুগ যদি কেটে যেত তখন; সেই চোখের দিকে চেয়ে। পরদিন মায়ের মুখে যখন শুনলাম তোমার রোরুদ্যমান সিজদার কথা, জানলাম কেমন উদ্ভ্রান্ত হয়ে গেছিলে তুমি ……….. । শব্দের দীনতা কী দিয়ে ঘোচাতে পারি বলো! এখন তো প্রতিটি প্রহরে, প্রতিটি মুহূর্তে, অণুক্ষণ আমি অনুভব করি আমার মায়ের স্বগতোক্তি, ‘আমার ছেলেটার ভাগ্য বেশ ভাল’।
মাঝে মাঝে মনে হয়, একদিন তো চলে যেতে হবে সব ছেড়ে। ছেড়ে যেতে এইসব মায়াবী ডাক, ঘুমহীন রাত, স্মৃতিমাখা বর্ষণ। ছেড়ে যেতে হবে তোমাকে, আমার ভালবাসাকে। বুকটা টনটন করে ওঠে তখন। যেহেতু এই চিঠি তোমার হাতে পড়বে না, তুমি জানবে না, তোমাকে দুঃখ দেওয়ার মাঝেও লুকিয়ে থাকে জীবনের এক চরম প্রাপ্তির লোভ। রুঢ় শোনালেও এটাই সত্যি, তোমাকে কাঁদতে দেখতে খুব মন চায় আমার। মনে হয়, তোমারই সামনে সাদা কাফন জড়িয়ে যেদিন শুয়ে থাকব আমি এইভাবে কাঁদবে তুমি। তোমার চোখ জুড়ে অশ্রুর মাখামাখি হবে এমন করেই। শত অপ্রাপ্তি আর পরাজয় নিয়ে আমি যখন নিথর পড়ে থাকব, যখন তোমার অশ্রু মুছে দেবার মত শক্তিও অবশিষ্ট থাকবে না দেহে, তখনও মনে হবে, আমি তো তোমাকে পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম তোমার চোখ, চোখের দুফোঁটা অশ্রু। যে অশ্রু দয়াময়ের পায়ে গড়িয়ে পড়ে মিনতি জানাবে, ওগো আল্লাহ! মাফ করে দাও তোমার এই পাপী বান্দাটাকে। ধুয়ে দাও এই অশ্রুর ফোঁটায় যতসব পঙ্কিলতা তার। আমি যে তাকে ভালবেসেছিলাম, খুব বেশী ভালবেসেছিলাম।
আজ খুব লেখতে চাইছে মন। তুমি দেখবে না তাই, বাধভাঙা আবেগ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার সমগ্র অস্তিত্ব। কিন্তু দেখো, এখনই ঝাপসা দেখছি সব। আর হয়ত লেখতে…………….
চিঠিটা মনে হচ্ছে আর এগোয় নি। উল্টেপাল্টে দেখল আবু মুআজ; নাহ, নেই। প্রেরক প্রাপক কারও নামই জানা গেল না। কি অদ্ভুত মানুষ আর অদ্ভুত চিঠি। নামটা পর্যন্ত লেখতে পারে নি লেখক। আনমনে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে গেল বুকটা হালকা করে। আবু আতিফকে দেখা গেল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বালু ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল আবু মুআজ। সূর্যটা ঝুলে পড়েছে। দ্রুত শুরু করতে হবে যাত্রা। আবু আতিফকে ডাকতে গিয়ে আচমকা প্রশ্নটা উদয় হলো মনে, যদি নাম লেখার সময়ই না পায় লেখক, তাহলে চিঠিটা আমার হাতে এলো কীকরে?