প্রশ্ন :

আসসালামুআলাইকুম উস্তায। উস্তায, সামনে আমার ভার্সিটি খোলা। আমার ৯ টি প্রশ্ন রয়েছে ভার্সিটি রিলেটেড। এই উত্তরগুলো আমার জন্য খুব বেশি ইম্পোর্টেন্ট। যেহেতু ইমানের প্রশ্ন অনেকটা।

১/ আমার কিছু ফ্রেন্ড আছে যারা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভার্সিটিতে উঠার পর ফ্রেন্ডদের একটি অংশ মনে করছে যে, সমকামিতা বৈধ এবং বাকি কিছু ফ্রেন্ড মনে করছে যে, এটা ব্যক্তির স্বাধীনতা। অর্থাৎ এটা ব্যক্তির চয়েজ, এখানে বিরোধিতা করার কিছুই নেই। এসবের প্রেক্ষিতে এদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? এবং এক্ষেত্রে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক কেমন হবে?

২/ আমার কিছু হিন্দু এবং খ্রিস্টান ফ্রেন্ড মনে করে যে, সমকামিতা বৈধ এবং এটাকে বাধা দেওয়া মানে ব্যক্তির অধিকার খর্ব করা। এবং তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও লিবারেল চিন্তাধারা লালন করে। এক্ষেত্রে এই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? এবং এদের সাথে আমার সম্পর্ক কেমন হবে?

৩/ “সমকামিতাকে বৈধ মনে করে এবং লিবারেল চিন্তাধারা লালন করে” – এমন কিছু ব্যক্তিকে আমার কিছু মুসলিম ফ্রেন্ড বিভিন্ন স্থানে প্রমোট করে এবং খুবই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। বিশেষত তাদের গান, কবিতা, অভিনয় ইত্যাদির কারণে। এক্ষেত্রে এই প্রমোট করা ফ্রেন্ডদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? এবং এদের সাথে আমার সম্পর্ক কেমন হবে?

৪/ ফেসবুকে বা বিভিন্নস্থানে মেয়েরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে – “তোমাকে বিয়ে করবো”, “আমি তোমার জামাই হবো”, ” চলো বিয়ে করি”, “ইশ, আমি যদি তোমার জামাই হতে পারতাম”, ” আমার লক্ষ্মী জামাই”, কিংবা এ জাতীয় আরো অনেক গভীর শব্দ ব্যবহার করে থাকে। যারা এ জাতীয় শব্দের ব্যবহার করে, তাদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি?

৫/ বিধর্মী কোনো সেলিব্রেটিকে (যেমনঃ বিটিএস সদস্য, ফুটবলার, অভিনেতা ইত্যাদি) বিয়ে করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করার ব্যাপারে ইসলামী শারীয়াহ কি বলে?

৬/ যদি কোন ফ্রেন্ড কোনো ফ্রেন্ডকে ‘গে’ কিংবা ‘লেসবিয়ান’ বলে সম্বোধন করে, তবে সম্বোধনকারীর ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? এবং ওখানে উপস্থিত ফ্রেন্ডদের ভূমিকা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কি হবে? (ভার্সিটিতে এ ধরনের শব্দ চয়ন খুবই নরমাল, তাই বিষয়টি জানা অতীব জরুরী)

৭/ ভার্সিটিতে যদি কোনো ম্যাম ক্লাস নেয়, তবে চোখের পর্দা কিছুটা মেইনটেইন করা পজিবল হলেও কন্ঠের পর্দা মেইনটেইন করা সম্ভব হয় না। এ ব্যাপারে করনীয় কি?

৮/ আমার এক ফ্রেন্ড সমকামিতা সম্পর্কে জ্ঞান হওয়ার আগেই এতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। পরবর্তীতে বোঝার পর সে ঐ পথ থেকে ফিরে আসে এবং একনিষ্ঠভাবে তাওবা করে। এখন সমকামিতাকে তীব্র ঘৃণা করে। সে কি ক্ষমা পাবে ইনশাআল্লাহ? নাকি আরো অন্য কোনো আমল করতে হবে?

৯/ নাস্তিক, লিবারেলরা বিভিন্নস্থানে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ ও ঠাট্টা-তামাশা করে। আমার অনেক ফ্রেন্ড-ই না বুঝে সেসব কটাক্ষকৃত পোস্ট শেয়ার করে এবং হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে। এক্ষেত্রে এদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?
আর অনেককেই এ ব্যাপারে সচেতন করা হলেও, তারা কোনো পাত্তা না দিয়ে সেই একই হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে৷ এদের ব্যাপারে ইসলামী শারীয়াহ-র দৃষ্টিকোণ কি?

উত্তর : ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী, যেসকল কাজ কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিল ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা হারাম করা হয়েছে সেগুলোকে হালাল মনে করা কুফরি। যে বা যারা সজ্ঞানে এমন কাজকে হালাল মনে করবে তারা ইমান থেকে বের হয়ে যাবে। তবে কেউ যদি এগুলোকে হালাল মনে না করে; যারা হালাল মনে করে তাদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রাখে ও বাধা প্রদান না করে তাহলে তাদের কাজকে কুফরি বলা যায় না; তবে এমন জঘন্য পাপীদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকা ও তাদের এহেন চিন্তাধারার প্রতি অন্তরে ঘৃণা লালন করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ইমানের নিম্নতর স্তর অতিক্রম করে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

ইসলামি শরিয়ামতে সমকামিতা বা homosexuality অত্যন্ত নিকৃষ্ট, গর্হিত ও সুস্পষ্ট হারাম কাজ। কুরআন কারিমে সুস্পষ্ট ভাষায় অকাট্য বক্তব্যে এটাকে নিকৃষ্ট কাজ, হারাম ও সীমালঙ্ঘন বলা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি আয়াতের অনুবাদ উল্লেখ করছি :

‘এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি ? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ। (আরাফ ৭:৮১-৮২)
‘সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’ (সূরা শুআরা ২৬:১৬৫-১৬৬)

‘স্মরণ কর লূতের কথা, তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেন, তোমরা কেন অশ্লীল কাজ করছ? অথচ এর পরিণতির কথা তোমরা অবগত আছ! তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়। উত্তরে তাঁর কওম শুধু এ কথাটিই বললো, লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়। অতঃপর তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম তাঁর স্ত্রী ছাড়া। কেননা, তার জন্যে ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম। (২৭:৫৪-৫৭)

‘আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের কাছে আগমন করল, তখন তারা বলল, আমরা লুতের জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব। নিশ্চয় এর অধিবাসীরা অপরাধী।’ (২৯:৩১)

সুতরাং প্রশ্নোক্ত ১ম ও ২য় ধরণের ব্যক্তিদের সাথে আচরণ তা-ই হবে যা অমুসলিমদের সাথে হওয়া উচিত। তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে এবং তাদের এমন চিন্তাধারার প্রতি ঘৃণা লালন করতে হবে। প্রথোমক্তরা নামে মুসলমান হলেও তারা কুফরিতে লিপ্ত। সুতরাং তাদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করা অপরিহার্য।

৩য় ধরণের ব্যক্তিরা যদি সমকামীদের সমকামিতাকে সমর্থন না করে; বরং অন্য কারণে তাদের প্রমোট করে ও তাদের সঙ্গ অবলম্বন করে তাহলে তারা ফাসিক বলে গণ্য হবে। তাদেরকে তাওবার দাওয়াত দিতে হবে। অন্যথায় তাদের থেকে দুরত্ব বজায় রাখতে হবে।

৪র্থ প্রশ্নে উক্ত কাজ নিঃসন্দেহে নির্লজ্জতা। সাধারণত মানুষ যখন বেহায়া হয়ে যায় তখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। সুতরাং ইসলামি শরিয়ামতে এরা ফাসিক ও নির্লজ্জ। তাওবা না করে মারা গেলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে মহাশাস্তির জাহান্নাম।

৫. বিধর্মী পুরুষকে বিয়ে করা ইসলামি শরিয়ামতে অকাট্যভাবে হারাম; আহলে কিতাব হলেও। সুতরাং কেউ যদি বিধর্মী পুরুষকে বিয়ে করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে তাহলে সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত। হ্যাঁ, সে যদি এটাকে হালাল মনে করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।

তবে বর্তমানকালের আহলে কিতাব মেয়েকে বিয়ে করার ব্যাপারে উলামাদের মতপার্থক্য রয়েছে। মেয়ে যদি প্রকৃতার্থেই আহলে কিতাব হয় (ধার্মিক ইহুদি বা খ্রিস্টান) সেক্ষেত্রে তাকে বিয়ে করার আকাঙ্ক্ষা করা গুনাহ নয়; তবে মেয়ে যদি প্রকৃতার্থে আহলে কিতাব না হয় বা অন্য ধর্মালম্বী হয় বা নাস্তিক-মুরতাদ হয় তাহলে তাকে বিয়ে করা অকাট্যভাবে হারাম। কোনো পুরুষ যদি এমন কাউকে বিয়ে করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে তাহলে সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত। হ্যাঁ, সে যদি এটাকে হালাল মনে করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।

৬. কাউকে গে বা লেসবিয়ান বলা ইসলামের দৃষ্টিতে যিনার অপবাদ দেওয়ার শামিল। যে বা যারা এমনটা বলবে তারা যদি এমন অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারে সেক্ষেত্রে ইসলামি আদালত তাকে বা তাদেরকে ৮০ টি বেতের বাড়ি মারবে। বোঝা যাচ্ছে, এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে তামাশা করা নিকৃষ্ট মূর্খতা। অবশ্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো এখন এমন মূর্খ প্রজন্মেরই গর্বিত গর্ভধারীনী।

৭. চেষ্টা করবে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেখানে নারী শিক্ষিকা পাঠদান করেন না। যদি তেমনটা সম্ভব না হয় তাহলে নজরের হিফাজত করবে ও ইস্তিগফার করবে। আর যদি বিকল্প কোনো পদ্ধতি বের করতে পারে তাহলে সেটাই উত্তম।

৮. ইনশাআল্লাহ, সে ক্ষমা পেয়ে যাবে; যদি না আর কখনো ফিরে না যায়। আমরা আশা করি, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বলেই এখন সে এই কাজকে ঘৃণা করতে পারছে। আল্লাহ তার তাওবা কবুল করুন ও ইমানের নুরে তাকে আলোকিত করুন। ৯. এরা কবিরা গুনাহে লিপ্ত। ইসলামি শরিয়ামতে এরা ফাসিক। তবে তাদের কেউ যদি এই ঠাট্টা-মশকরা করাকে হালাল বা জায়েজ মনে করে তাহলে তার ইমান চলে যাবে। এব্যাপারে অনেককেই উদাসীন দেখা যায়। জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ইমানকে হাসি-মজার ছলে বিসর্জন দেওয়া নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যের নিদর্শন।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট