গুগল করার মজা

ইঁচড়ে পাকা বলে বাংলায় যে বাগধারাটা আছে শাইখের মন চাচ্ছে সামনে দাঁড়ানো শুকনো মতো চশমাওয়ালা ছেলেটাকে চরম একটা ধমক দিয়ে শব্দটা বলতে। নিজের ভেতরে তিনি রাগের উষ্ণ ভাপ অনুভব করছেন। প্রচণ্ড রাগে ছেলেটাকে তার আছাড় দিতে ইচ্ছে করছে।

ঘটনা হলো, মিষ্টি হাসি দিয়ে শাইখ যখন ‘দারস’ দিতে কামরায় প্রবেশ করেছেন এবং কুশলাদি বিনিময়ের পর পড়ানো আরম্ভ করবেন বলে মনস্থ করেছেন ঠিক তখন অল্প বয়েসী ঠ্যাঙ্গা ছেলেটা ‘শাইখ, আমার একটা প্রশ্ন আছে’ বলে হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। এমনিতেই বিগত দারসের দীর্ঘ লেকচারের পর থেকে শাইখের বারবার মনে হয়েছে বিষয়টাকে তিনি জটিল করে তুলছেন। এভাবে শাস্ত্রীয় আলোচনায় ঢুকে পড়লে ‘সহজ মুজতাহিদ কোর্স’ আর সহজ-সরল থাকবে না; জটিল ও কঠিন হয়ে যাবে। আজ আসতে আসতে মনস্থ করেছেন, নতুন করে আবার শুরু করবেন তিনি। যা হয়েছে তো হয়েছে; পুরনো আলাপ বাদ। কিন্তু বাদ ভাবলেই তো আর বাদ হয়ে যায় না। গুগল নামক যে ‘অমৃতের’ সন্ধান তিনি অংশগ্রহণকারীদের দিয়েছেন একরাতেই তা ‘গ্যাস্ট্রিক’ জন্ম দিয়ে ফেলেছে। শাইখ কিছু বলার আগেই ছেলেটা প্রশ্ন করে বসেছে :

  • গতকাল শাইখ বলেছিলেন, সহিহ হাদিস মোতাবেক আমল করলেই ল্যাঠা চুকে যায়। ল্যাঠা চুকে গেলে খারাপ হতো না। কিন্তু, শাইখ, রাতে গুগলে সার্চ করে দেখলাম সহিহ হাদিসের সংজ্ঞা নিয়ে ল্যাঠাল্যাঠি আছে বিস্তর; তেরশ বছর ধরেও ল্যাঠা চোকে নি। শাইখ যে পাঁচটা শর্ত বলেছেন হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য, দেখলাম, সেসবে সকল ইমাম একমত নন। বরং উম্মাহর বড় বড় অনেক ইমাম একমত নন। অনেকে দুটো শর্ত আরোপ করেছেন। অনেকে তিনটা করেছেন। অনেকে চারটাও করেছেন। বিশেষত শেষ যে দুটো শর্তের কথা শাইখ বলেছেন, শাজ না হওয়া ও ইল্লত না থাকা, এ দুটো শর্ত উম্মাহর একটা বিরাট অংশ মেনে নেন নি। তারা শর্ত দুটোকে অদরকারি বলেছেন। তাহলে কাদের কথা আমরা মেনে নেবো? কেন? এবং সহিহ হাদিস নির্বাচনের উপায় কী?

টেবিলে কাঁচের গ্লাসে পানি। শাইখ চুমুক দিয়ে সামান্য পানি পান করলেন। ঠাণ্ডা পানি অনেক সময় মেজাজ ঠাণ্ডা করে দেয়। মেজাজ কিছুটা নিয়ন্ত্রন করে শাইখ যেইমাত্র জবাব দেবার উদ্যোগ করেছেন, ছেলেটা আবার কথা বলতে শুরু করলো। ভদ্রতা বা শিষ্টাচারের চেয়ে গতরাতে শেখা গুগল-বিদ্যা জাহির করাই প্রধান কর্তব্য বলে মনে হলো তার। সে বলে যেতে লাগল :

  • আরও ব্যাপার আছে, শাইখ। আপনি যেসব শর্ত বলেছেন সেসবের প্রায় প্রতিটা নিয়েই আছে বিস্তর মতপার্থক্য। আমরা যদি প্রথম শর্তটার কথাই বলি, সনদ অবিচ্ছিন্ন হওয়া, এটা নির্ধারণ করার পদ্ধতি নিয়ে আছে বিরাট ইখতিলাফ; মানে মারাত্মক মতবিরোধ। আমরা জানি ইমাম বুখারি [২৫৬ হি.] ও ইমাম মুসলিম [২৬১ হি.] সহিহ হাদিসের শ্রেষ্ঠ দুটো সংকলন তৈরী করেছেন। পুরো উম্মত তাদের কিতাব দুটোকে সহিহ হিসেবে মেনে নিয়েছে। যদিও আমাদের জানায় কিছুটা ভুল আছে। অনেক ইমাম মেনে নেন নি; ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কিন্তু তারপরও যদি ধরে নিই তাদের কিতাব দুটো সহিহ, তাহলে আমরা দেখি এই মহান দুজন ইমামও হাদিস সহিহ হওয়া, বিশেষত সনদ অবিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে চরম মতপার্থক্যে লিপ্ত হয়েছেন।

শাইখের মেজাজ খিচড়ে যাচ্ছে। এই ছেলের কথার রেলগাড়ি যেদিকে যেতে শুরু করেছে সেদিকে মুখ হা করে আছে অতল বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র। সেসবের আলোচনা তুলতে গেলে এই সহজ মুজতাহিদ কোর্সের নাম বদলে ফেলতে হবে। নাম রাখতে হবে ‘জটিল ও কঠিন মুজতাহিদ কোর্স’। শাইখ যথেষ্ট বিরক্তি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করলেন চেহারায়। কিন্তু চশমু ছেলটা তখন ‘বলো না ভাইরাস’-এ পুরোপুরি কাবু। শাইখের দিকে একরকম না তাকিয়েই সে বলে চলল :

  • ইমাম বুখারি বলেছেন হাদিস সহিহ হতে হলে বর্ণনাকারী যার সূত্রে বর্ণনা করছেন তার সাথে তার সাক্ষাত প্রমাণিত হতে হবে। অর্থাৎ দুজনের সাক্ষাত হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলে বুঝতে হবে হাদিসটি অবিচ্ছিন্ন নয়; সনদ বিচ্ছিন্ন। ফলে হাদিসটি আর সহিহ হবে না; যয়িফ হয়ে যাবে।

বিপরীতে ইমাম মুসলিম মনে করেন, দুজনের সাক্ষাত প্রমাণিত হওয়া জরুরি নয়। দুজন সমকালীন হলেই হবে। একই সময় দুজন জীবিত আছেন এবং দুজনের দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও আছে, এমন হলেই হবে। সুতরাং দুজনের সাক্ষাত হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া না পাওয়া গেলেও কেবল সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তিনি হাদিসকে সহিহ বলেন। এবং নিজের এই মতের পক্ষে তিনি ইজমার দাবি করেছেন। অর্থাৎ তার মতে এ ব্যাপারে গোটা পৃথিবীর সকল আলিম একমত; যারা একমত নন তারা হাদিস বিনষ্ট করে চলেছেন। কথাগুলো বেশ কড়া ভাষায় ইমাম মুসলিম বলেছেন সহিহ মুসলিমের ভূমিকায়।

এখন, শাইখ, আমরা যদি হাদিস সহিহ হওয়ার প্রথম শর্তটিও দেখি তো প্রশ্ন দাঁড়ায়, কার মত অনুযায়ী এটা সহিহ। যদি বলা হয় ইমাম বুখারির মত অনুযায়ী, তাহলে তো সমস্যা নেই; কিন্তু ইমাম মুসলিমের মতে,  এর ফলে হাদিস বিনষ্ট করার পথ তৈরী হবে। আর যদি বলা হয় ইমাম মুসলিমের কথা অনুযায়ী, তাহলে খুব সহজেই আমরা যেটা বুঝি, সনদ অবিচ্ছিন্ন প্রমাণিত না হওয়ায় ইমাম বুখারি হাদিসটিকে সহিহ বলবেন না। এবং এই সমস্যা যত হাদিসে দেখা দেবে তত হাদিসেই সহিহ হওয়া, না-হওয়া নিয়ে দুজনের ভেতর বিতর্ক তৈরী হবে। তাহলে কি আমরা ইমাম মুসলিমের বলা সহিহ হাদিসগুলো বাদ দেবো?

কোর্সে ইনরোলকারীরা এতক্ষণ চশমা পরা ছেলেটার কথা হা করে শুনছিল। তার প্রশ্নবোধক বাক্য শেষ হতেই সবগুলো চোখ একসাথে শাইখের দিকে ঘুরে গেলো। শাইখ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। এতক্ষণ চুপ করে শুনতে শুনতে গলা তার জলশূন্য হয়ে গেছে। গলায় বল পাচ্ছেন না। টেবিলে রাখা পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়ালেন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সামনে বসা নেতাগোছের ভদ্র ছেলেটা কথার মোড় ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার পায়তারা করলো।

  • অনেক ভাই কিন্তু এখনও কোর্সের ফি পরিশোধ করেন নি। দ্রুত কোর্স ফি পরিশোধ করে দিলে ভাল হয়। এভাবে টালবাহানা করা ভাল নয়। সহিহ বুখারিতে এসেছে :

مَطْلُ الغَنِيِّ ظُلْمٌ

পয়সাওয়ালা লোকের তালবাহানা করা জুলুম। [সহিহ বুখারি : ২২৮৭]

কথাটা কারও গায়ে লাগলো কিনা বোঝা গেল না। তবে ভাইটির সহিহ হাদিস সমাপ্ত হওয়ার পর তীব্র এক গুগলি এলো পেছন থেকে। এক দুর্মুখো বলে বসল : ভাই, কুরআন কারিমে আছে, ﴾এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ করো না﴿ [সুরা মায়িদাহ : ৩৪] সুতরাং কুরআন বলছে এভাবে পয়সা নেওয়াটা ঠিক নয়। তাছাড়া আবু দাউদ শরিফের হাদিসে আছে, উবাদা বিন সামিত থেকে বর্ণিত, কুরআন ও দীনি জ্ঞান শিখিয়ে পয়সা নেওয়ার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : জাহান্নামের বেড়ি গলায় পড়তে যদি পছন্দ করো তো পয়সা নাও। [সুনান আবু দাউদ, হা. – ৩৪১৭]

গুগলি এসে গায়ে পড়ার সাথে সাথে সামনে বসা ছেলেটা রেগে কাই হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কামরাজুড়ে তখন হৈচৈ চলছে। সবাই একযোগে বক্তৃতা শুরু করেছে। টাকার মাসলা বড় মাসলা। এই মাসলায় সবাই ‘কঠিন মুজতাহিদ’।

নেতাগোছের ভদ্র ছেলেটা দুর্মুখোটার মুখের ওপর শক্ত একটা জবাব দেওয়ার আগেই শাইখ জলদগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষনা করলেন, আজকের মত দারস শেষ। সবাই যার যার মত বাড়ি ফিরে যাও। আগামী দারসের সময় পড়ে জানানো হবে। তবে, কোনো দলিল-প্রমাণ তালাশ করা ছাড়া যারা একান্ত অনুগত হয়ে আমার দারসে বসতে আগ্রহী কেবল তারাই ‘সহজ মুজতাহিদ কোর্সে’র আগামী দারসে আসতে পারবে। অন্যদের আসার দরকার নেই। সবাই ভাল থাকো। জাযাকুমুল্লাহ।

দারস শেষ হয়ে গেল। সবাই মন খারাপ করে বাড়ি চলে যাচ্ছে। শাইখের মন বিষণ্ন। অভিনব যে কোর্সটা তিনি শুরু করেছিলেন, সেটা বোধ হয় আর চালানো গেল না। ছেলেপেলে কতটা বদমাইশ হলে পয়সা না দিয়ে উল্টো হাদিস শোনাতে পারে। ওরা কি জানে, হাদিসটা সহিহ হওয়া নিয়ে উলামাদের মতপার্থক্য আছে। ভাবতে ভাবতে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন।

আমাদেরও বিষণ্ন লাগে খুব। আজীবন তাকলিদে শাখসির বিরোধিতাকারী শাইখ নিজেই ছাত্রদের তাকলিদের হুকুম দেওয়ার পরও অনুভব করেন না; আসলে দিনশেষে তিনিও তাকলিদে শাখসির বাইরের কেউ নন। বাইরে হওয়া সম্ভবও না। তাকলিদ না থাকলে এভাবেই অরাজকতা তৈরী হবে সর্বত্র। শুরু হবে হানাহানি, মারামারি। কিন্তু হিদায়াত এক সোনার হরিণ; আল্লাহ যাকে দেন কেবল সেই পায়। চোখ তো সবারই আছে; কিন্তু সামনে দিয়ে চলে যাওয়া সুযোগ অধিকাংশ সময়ই ‘পতিত’ ব্যক্তি চোখে দেখে না।

#সহজমুজতাহিদকোর্স – ৩

বি. দ্র. : এই লেখা কাউকে খোঁচা দেওয়ার নিমিত্তে নয়; বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ মাত্র। আমরা চাই, বাস্তবতা অস্বীকারের যে ‘অন্ধত্ব’কে এখন জ্ঞান বলে প্রচার করা হচ্ছে, এটা যাতে প্রচারকারী এবং সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করেন। জ্ঞানের যেমন মৌল ও শাখাগত বিষয় আছে; আছে জ্ঞানী হওয়ার মৌলিক ও শাখাগত শর্ত। ইলমের পথে যারা চলতে আগ্রহী তাদের উচিত কষ্ট, অনাহার ও অপদস্থতা সঙ্গী করে হলেও নবির উত্তরাধিকারপ্রাপ্তি ও সংরক্ষণের এই পরম মর্যাদার পথে সকল নিয়মনীতি মেনে অগ্রগামী হওয়া।

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট