সহজ মুজতাহিদ কোর্সে বিগত পোস্টের কথা উঠলে শাইখ বেশ বিরক্ত হলেন। বাচ্চা ছেলে ইবরাহিমের কথাগুলো তার কাছে কুযুক্তি মনে হলো। হাদিস মোতাবেক মাসআলা দিতে হলে আগে মুসনাদ, মুরসাল, মুযাল জানতে হবে কেন? সহিহ-যয়িফ চেনা এই জমানায় কঠিন কিছু হলো! গুগল করলেই তো হাদিসের নাড়ী-নক্ষত্র বেরিয়ে আসবে। কোন হাদিস যয়িফ, কেন যয়িফ তামাম খবর চলে আসবে রেফারেন্সসহ। তারপর সহিহ হাদিসগুলো বেছে বেছে আমল করলেই তো হয়। জাল-যয়িফ হাদিস বাদ দিলেই চুকে যায় ল্যাঠা। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শাইখ সৌদিদের কায়দায় মাথায় তোলা রুমালের মাঝখানটা চোখা করে নিলেন। দম নিয়ে কোর্সে ‘ইনরোল’কারীদের উদ্দেশে বক্তৃতা শুরু করলেন :
- বিষয়টাকে অযথা জটিল করার তো কোনো দরকার নেই। সহিহ হাদিস বলে একটা জিনিস তো আছে। সহিহ হাদিস মানে নিঃসংশয়ে হাদিসগুলোর ওপর আমল করা যায়। মুহাদ্দিসগণ যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাদিসগুলো সহিহ; গ্রহণযোগ্য। সুতরাং অযথা জটিলতায় না জড়িয়ে সহিহ হাদিসের ওপর আমল করলেই সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলা যায়। আর, সহিহ হাদিস খুঁজে বের করা তো কঠিন কিছু না। প্রায় প্রতিটা হাদিসগ্রন্থই এখন তাখরিজসহ বের হয়। সেখানে মুহাক্কিকরা হাদিসের হুকুম লিখে দেন। তাছাড়া বেশী সংশয় হলে গুগলে সার্চ করা যেতে পারে। সেখানে আরবের বড় বড় শাইখের হাদিস সম্পর্কিত আলোচনা পাওয়া যাবে সহজেই। হাদিসের নাড়ী-নক্ষত্র পর্যন্ত বেরিয়ে আসবে তুড়ুক করে। সুতরাং কেবল সহিহ হাদিসকে সামনে রেখেই আমরা সহজ পন্থায় মুজতাহিদ হতে পারি। আদ-দীনু ইয়ুসরুন। দীন সহজ। অযথা মৌলভীরা এটাকে কঠিন করে রেখেছে।
শাইখের বক্তব্যের পর আগত শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে স্বস্তি দেখা গেল। এত পয়সা খরচ করে ভর্তি হওয়াটা জলে যাচ্ছে না ভেবে আশ্বস্ত হলো। চাপা স্বরে পাশের জনকে শাইখের কথাটাই বোঝাবার চেষ্টা করল কেউ কেউ। কিন্তু কূপমণ্ডুক তো সর্বত্র বিরাজমান; মানে সব জায়গাতেই থাকে। কোর্সেও ছিল। এক কূপমণ্ডুক হাত তুলে উঠে দাঁড়াল।
- প্রিয় শাইখের কথা আমরা বুঝতে পেরেছি। নিঃসন্দেহে শাইখ যা বলেছেন, সত্য বলেছেন। সহিহ হাদিসগুলো মেনে চললেই সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর টিকে থাকা সহজ। কিন্তু শাইখ, আমাদের কৌতুহল হলো, সহিহ হাদিস বলতে আসলে কী বোঝায়?
- বেশ সুন্দর প্রশ্ন করেছ তুমি। মাশাআল্লাহ, এমন অনুসন্ধিৎসা না থাকলে কি মুজতাহিদ হওয়া যায়। আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দিন। যাইহোক, শোনো। অভিধানে সহিহ মানে বিশুদ্ধ। সহিহ হাদিস মানে বিশুদ্ধ হাদিস। পরিভাষায় সহিহ হাদিস বলা হয়, যে হাদিসে পাঁচটি গুণ বিদ্যমান থাকে। একটি গুণ হাদিসের সনদে। দুটি গুণ হাদিস বর্ণনাকারীর মধ্যে। এবং অবশিষ্ট দুটি নঞর্থক গুণ সনদ-মতন উভয়টিতে। সনদ মানে সূত্র, মতন মানে মূলপাঠ বা টেক্সট। নঞর্থক গুণ মানে এই দুটো না থাকতে হবে। গুণগুলো হলো :
১. সনদ মুত্তাসিল হওয়া। মুত্তাসিল মানে অবিচ্ছিন্ন। রাসুল থেকে নিয়ে বর্ণনাকারী পর্যন্ত সূত্র অবিচ্ছিন্ন হওয়া। মাঝখানে কোনো বর্ণনাকারী বাদ না পড়া।
২. হাদিসের বর্ণনাকারী আদিল হওয়া। আদিল মানে ন্যায়পরায়ন। আদিল দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সে ফাসিক, বিদআতি, মিথ্যুক, মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত বা অভব্য আচরণকারী না হওয়া।
৩. বর্ণনাকারী সঠিকভাবে হাদিস সংরক্ষণে সক্ষম হওয়া। সংরক্ষণ দুভাবে হতে পারে। ১. স্মৃতিশক্তির সাহায্যে সংরক্ষণ। ২. লিখিত আকারে সংরক্ষণ। স্মৃতিশক্তির দ্বারা সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হলো এমনভাবে মুখস্থ করা যে, যখন ইচ্ছে স্মরণ করতে পারে; কষ্ট হয় না। এবং একইসাথে ভিন্ন পাঁচটি দোষ থেকে মুক্ত হয় : ক. স্মৃতিদৌর্বল্য। খ. হাদিস বর্ণনায় মারাত্মক ভুল। গ. অধিক পরিমাণ সংশয়। ঘ. অসচেতনতা। ঙ. এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিরোধিতা। এই দোষগুলো থেকে পবিত্র হতে হবে।
৪. হাদিসটি শাজ হতে পারবে না। শাজ কাকে বলে সেটা নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। তবে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মত হলো, হাদিসটি তদপেক্ষা অধিক শক্তিশালী বর্ণনাকারীর হাদিসের বিপরীত বা বিরোধী হতে পারবে না।
৫. হাদিসটির সনদে বা মতনে কোনো কোনরকম গোপন দোষ বা ত্রুটি থাকতে পারবে না। আরবিতে এটাকে বলে ইল্লত। আবার ইল্লত থাকলেই হবে না; সেটাকে হতে হবে কাদিহাহ। মানে এমন ত্রুটি যা হাদিসটিকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। ইল্লতে কাদিহাহ নেই এটা নিশ্চিত করা গেলে তবেই হাদিসটিকে সহিহ বলা যেতে পারে। নতুবা হাদিসকে সহিহ বলা যাবে না।
শাইখের এই দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে সহজ মুজতাহিদ কোর্সে আগত জ্ঞানপিয়াসীদের মাথায় তখন ‘মাছি ভনভন’ অবস্থা। কারও ফোঁড়া টনটন করতে শুরু করেছে। কেউ খনখন করে কাশতে শুরু করেছে। যে ছেলেটা প্রশ্নটা করেছিল, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে লেকচার শুনতে শুনতে তারও খানিকটা ঝিমঝিম লাগছে। লাল চোখ দেখে মনে হচ্ছে নিদ্রা-ম্যাডাম চলে হনহন করে তেড়ে আসছে তার দিকে। তবু সিটে বসার আগে দুর্দম্য কৌতুহল চাপতে না পেরে সে হালকা করে জিজ্ঞেস করে ফেলল, এই শর্তগুলো পেলেই কি আমরা হাদিসকে সহিহ বলে দিতে পারবো, শাইখ?
শাইখ যেন নতুন করে আপন শক্তিতে জ্বলে উঠলেন : দেখো, এখানেও কিছু কথা আছে। ……..
শাইখ সম্ভবত আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘড়িতে চোখ পড়তেই শিক্ষার্থীদের উসখুসের কারণটা তিনি ধরতে পারলেন। সময় বেশ গড়িয়ে গেছে। আজকের মত কোর্স মুলতবি না করলে আগামীতে ব্যবসা লাটে উঠবে।