ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও নেতৃত্ব

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনব্যবস্থা ইসলামের দৃষ্টিতে নেতা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। সাধারণত, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রার্থীকে সর্বপ্রথম নমিনেশন ফরম পূরণের মাধ্যমে পদপ্রাপ্তির জন্য দরখাস্ত করতে হয়। সহজ করে বললে, রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব পেতে হলে নিজেকে যোগ্য দাবি করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলের কাছ থেকে সেই পদ চেয়ে নিতে হয়। নেতা নির্বাচনের ও দায়িত্ব প্রদানের এই পদ্ধতিটি ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী গর্হিত ও অপছন্দীয়। বরং নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদত্ত মূলনীতি হলো :

إِنَّا لنْ نَسْتَعِينَ عَلَى الْعَمَلِ مَنْ أَرَادَهُ

যে (কোনো কাজের দায়িত্ব) প্রার্থনা করে আমরা কক্ষনো তাকে সেই দায়িত্ব দিই না। (সুনানুন নাসায়ি, হা. -৪)

বরং পদ ও পদবি চেয়ে নেওয়ার প্রতি অনুৎসাহিত করে বিশিষ্ট সাহাবি আবদুর রহমান বিন সামুরা রা.-কে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন :

يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ سَمُرَةَ، لاَ تَسْأَلِ الإِمَارَةَ، فَإِنَّكَ إِنْ أُوتِيتَهَا عَنْ مَسْأَلَةٍ وُكِلْتَ إِلَيْهَا، وَإِنْ أُوتِيتَهَا مِنْ غَيْرِ مَسْأَلَةٍ أُعِنْتَ عَلَيْهَا

হে আবদুর রহমান বিন সামুরা, কখনো নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না। যদি চাওয়ার প্রেক্ষিতে তুমি নেতৃত্ব লাভ করো তাহলে তোমার ওপর তার দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি না চাইতে পেয়ে যাও তাহলে দায়িত্ব আদায়ে তুমি (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সহায়তা লাভ করবে। (সহিহ বুখারি, হা.- ৬৬২২)

বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা. একবার নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। সাথে আশআর গোত্রের আরও দুজন সাহাবি ছিলেন। নবিজি তখন মিসওয়াক করছিলেন। সঙ্গী দুজন নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কাজ বা বিশেষ কোনো দায়িত্ব চেয়ে বসলেন। এমন কিছু ঘটবে আবু মুসা আশআরি রা. আগে আঁচ করতে পারেন নি। তিনি আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, যিনি আপনাকে সত্য নবিরূপে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার শপথ, তাদের অন্তরে কী ছিল আমাকে অবগত করেনি। আর আমিও বুঝতে পারিনি, তারা (এভাবে) কাজ চাইবে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে কাজ বা পদ চায় আমরা তাকে দেই না। তবে তুমি যাও। নবিজি আবু মুসা আশআরি রা.-কে ইয়েমেনে পাঠান আর মুয়াজ ইবনু জাবালকে তাঁর পরে অনুগামী হিসেবে পাঠান। (সুনানুন নাসায়ি, হা. -৪)

তবে, যদি নেতৃত্বের সংকট তৈরী হয় এবং যোগ্য ব্যক্তির অভাবে পদ ও কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের পথও ইসলাম খোলা রেখেছে। কোনো যোগ্য ব্যক্তি যদি আপন যোগ্যতার ব্যাপারে আশ্বস্ত হন এবং অন্য কারও মাধ্যমে উদ্ভুত সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন তাহলে উক্ত কাজের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করা ও অগ্রসর হয়ে দায়িত্ব চেয়ে নেওয়ার বৈধতা ইসলাম রেখেছে। মিসরের জনগণের আসন্ন সংকট দেখে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এভাবেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন এবং মিসর-সম্রাট থেকে দায়িত্ব চেয়ে নিয়েছিলেন। নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি আশ্বস্ত ছিলেন। অন্যদের আশ্বস্ত করতে বলেছিলেন :

قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ

আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান। [সূরা ইউসুফ-৫৫]

সায়্যিদুনা ইউসুফ আলাইহিস সালামের এই ‘অনুসরণীয়’ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তাফসিরে মাআরিফুল কুরআনে মুফতি শফি রাহিমাহুল্লাহ লেখেন :

اگر آج بھی کوئی شخص یہ محسوس کرے کہ کوئی عہدہ حکومت کا ایسا ہے جس کے فرائض کو کوئی دوسرا آدمی صحیح طور پر انجام دینے والا موجود نہیں اور خود اس کو یہ اندازا ہے کہ میں صحیح انجام دے سکتا ہوں تو اس کے لئے جائز ہے بلکہ واجب ہے کہ اس عہدہ کی خود درخواست کرے مگر اپنے جاہ ومال کے لئے نہیں بلکہ خدمت خلق کے لئے جس کا تعلق قلبی نیت اور ارادہ سے ہے جو اللہ تعالیٰ پر خوب روشن ہے ۔

আজও যদি কেউ অনুভব করে, রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব বা পদ এমন বেহাল দশায় রয়েছে যা সঠিকভাবে আঞ্জাম দেওয়ার মত কেউ নেই এবং নিজের ব্যাপারে সে আশ্বস্ত যে, যথাযথভাবে আমি দায়িত্ব আদায় করতে পারবো, তাহলে তার জন্য পদ-প্রার্থনা কেবল বৈধ নয়; বরং ওয়াজিব। পদ ও সম্পদের জন্য নয়; সৃষ্টির সেবার জন্য তাকে এটা করতে হবে। এবং এর সম্পর্কে হৃদয়ের সাথে, যার খবর আল্লাহ তাআলা ভাল করে জানেন। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন : ৫/৯০)

নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে মনোনয়ন প্রার্থনা করবে তারা নবিজির উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ লেখেন :

عام اسلامی حکم یہی یہی ہے کہ از خود کسی سرکاری عہدے یا منصب کو اپنے لئے طلب کرنا جائز نہیں اور ایسا شخص مطلوبہ منصب کا اہل نہیں ہوتا، لیکن بعض استثنائی صورتوں میں جہاں یہ بات واضح ہو کہ اگر کوئی شخص خود اس منصب کو طلب نہیں کرے گا تو نااہل اور ظالم لوگ اس پر قبضہ کر کے لوگوں پر ظلم کریں گے، تو ایسے وقت میں عہدے کو طلب کرنے کی شرعاً اجازت ہے۔ اور حضرت یوسف علیہ السلام کا: “اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ ” کہنا اسی صورت پر محمول ہے۔ اس شرعی اصول کو مد نظر رکھتے ہوئے موجودہ انتخابات کا حکم معلوم کیا جا سکتا ہے کہ طلب اقتدار کی بنیاد پر پورا نظام حکومت قائم کرنا اصلاً جائز نہیں ہے، اور اگر منشاء صرف طلب اقتدار ہو، یا دوسرے اہل لوگ موجود ہوں، یا کسی اور طریقے سے غلط نظام کو بدلنا ممکن ہو تو ایسے نظام انتخابات میں اُمیدوار بننا جائز نہیں۔ لیکن اگر موجودہ غلط نظام کو بدلنے کا اس کے سوا کوئی راستہ نہ ہو، تو صالح اور اہل افراد اگر طلب اقتدار کے جذبے کے بجائے اصلاح حال کی غرض سے اس میں شامل ہوں تو اس کی گنجائش ہے، بشرطیکہ مفاسد سب وشتم ، غیبت اور دوسرے محرمات و منکرات سے مکمل پر ہیز کا اہتمام ہو، جو اس دور میں شاذ و نادر ہے۔

সাধারণ ইসলামী বিধান হলো—নিজ থেকে কোনো সরকারি দায়িত্ব বা পদ নিজের জন্য প্রার্থনা করা বৈধ নয়; এবং যে ব্যক্তি নিজে থেকেই কোনো পদ কামনা করে, সে ঐ পদের উপযুক্তও বিবেচিত হয় না। তবে কিছু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে—যদি যোগ্য ব্যক্তি নিজে থেকে সেই দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন না করেন, তাহলে অযোগ্য ও জালিম লোকেরা সেটি দখল করে নেবে এবং মানুষের ওপর অত্যাচার চালাবে—তাহলে এ অবস্থায় ঐ দায়িত্ব প্রার্থনা করা শরীয়ত অনুযায়ী বৈধ। হযরত ইউসূফ (আ.)–এর উক্তি: “اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ”—এ ধরনের অবস্থারই অন্তর্ভুক্ত।

এই শর‘ঈ নীতিকে সামনে রেখে সমসাময়িক নির্বাচন ব্যবস্থার বিধান বোঝা যায় যে—কেবল ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্যে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা মূলত বৈধ নয়। এবং যদি উদ্দেশ্য হয় শুধুমাত্র ক্ষমতালিপ্সা, অথবা অন্য যোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতি থাকে, অথবা অন্য কোনো পন্থায় ভুলব্যবস্থার সংস্কার করা সম্ভব হয়—তাহলে এমন নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রার্থী হওয়া বৈধ নয়।

কিন্তু যদি বিদ্যমান ভুল ও দূষিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের আর কোনো পথ না থাকে, তাহলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি যদি ক্ষমতার লোভ থেকে নয় বরং পরিস্থিতি সংস্কারের অভিপ্রায়ে এতে অংশগ্রহণ করেন, তবে এর অনুমতি রয়েছে—শর্ত এই যে, গালিগালাজ, পরচর্চা, এবং অন্যান্য সকল হারাম ও মন্দ কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পূর্ণ যত্ন নেওয়া আবশ্যক—যা এই যুগে অত্যন্ত দুর্লভ। [ফতোয়ায়ে উসমানি : ৩/৫০৭]

নেতৃত্ব নির্বাচনে এত সতর্কতা কেন?

প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেতৃত্বকে মূলত কর্তৃত্ব মনে করা হয়। জনগণের সেবার সুযোগ চাই বলে ‘ভোট’ প্রার্থনাকারীরা নির্বাচনে জয় লাভের পর নিজেদের সেবক না ভেবে কর্তা ভাবেন। জনগণের সেবার বদলে শাসন ও শোষণ করেন। ক্ষমতার বাগডোর হাতে পাওয়ার পর এই ধরণের পরিবর্তন সর্বত্র দেখা যায়। কারণ দায়িত্ব ও ক্ষমতাকে সেবার সুযোগ মনে না করে কর্তৃত্ব অর্জন বলে জ্ঞান করা হয়।

বিপরীতে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ক্ষমতা ও দায়িত্ব একটি পবিত্র আমানত। জনপ্রতিনিধি বা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা মূলত দেশ ও জাতির সম্পদ ও অধিকারের আমানত রক্ষাকারী। আমানত যেমন চেয়ে নেওয়ার বস্তু নয়; নেতৃত্ব ও দায়িত্বও চেয়ে নেওয়ার জিনিস নয়। আমানত যেমন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া পাপ; রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্বও অযোগ্য কারও হাতে তুলে দেওয়া ভয়ঙ্কর অপরাধ। এমনকি ব্যক্তি যোগ্য হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার দুর্বলতা থাকলে নেতৃত্বের ভার কিংবা রাষ্ট্রীয় পদের দায় তার কাঁধে তুলে দেওয়া বৈধ নয়।

সায়্যিদুনা আবু জর গিফারি রা. ছিলেন প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। ইসলামের জন্য তার ত্যাগ-তিতিক্ষা অনস্বীকার্য। তার দাওয়াতে পুরো গিফার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বাচনিক সত্যবাদিতায় আবু জরের চেয়ে উত্তম কোন ব্যাক্তিকে আসমান ছায়াদান করেনি, পৃথিবী বুকে ধারণ করেনি।’ [সুনানু ইবনু মাজাহ, হা.-১৫৬] তিনি একদিন নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন,

يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تَسْتَعْمِلُنِي؟

ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে কি কোনো অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করবেন না?

উত্তরে নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাঁধে হাত রাখলেন। সস্নেহে বললেন,

 «يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا»

হে আবু জর! তুমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ; আর শাসনকার্য হলো একটি আমানত। নিশ্চয় তা হবে কিয়ামতের দিন অপমান ও লাঞ্ছনা; তবে সে ব্যক্তি ব্যতীত, যে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে গ্রহণ করেছে এবং নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছে!

অপর এক বর্ণনাতে আছে- তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বললেন, হে আবু জর, আমি দেখছি, তুমি দুর্বলচিত্তের মানুষ। আমি তোমার জন্য সেটাই পছন্দ করি, যা নিজের জন্য পছন্দ করি। তুমি কক্ষনো দু’জন লোকেরও শাসক হয়ো (দায়িত্বভার নিও) না। আর ইয়াতিমের ধন-সম্পদের অভিভাবকও হয়ো না। [সহিহ মুসলিম : ১৮২৫]

নেতৃত্ব যেহেতু আমানত তাই যোগ্য ব্যক্তির হাতে তা তুলে দেওয়া কর্তব্য। অযোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ কেয়ামত ত্বরান্বিত করা। কুরআন কারিমে যোগ্য ব্যক্তির হাতে আমানত পৌঁছে দেওয়ার প্রতি রব্বে কারিমের আদেশের কথা বিবৃত হয়েছে।

(إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا )

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। [সুরা নিসা, ৫৮]

প্রচুর হাদিসে এসেছে, অযোগ্যের হাতে ক্ষমতা কিংবা দায়িত্ব তুলে দেওয়ার অর্থ হলো কিয়ামত ডেকে আনা। যখন অযোগ্যদের হাতে ক্ষমতার বাগডোর তুলে দেওয়া হবে এবং আমানত নষ্ট করা হবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।

عَنْ أَبِـيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِذَا ضُيِّعَتْ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرْ السَّاعَة قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ إِذَا أُسْنِدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرْ السَّاعَةَ

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। এক বেদুইন বলল, ’আমানত কিভাবে নষ্ট হবে?’ তিনি বললেন, যখন কোন অযোগ্য লোকের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৯৬)

নির্বাচনে কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো, তার যোগ্যতার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া। ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার অর্থ ক্ষমতার বাগডোর তার হাতে তুলে দেওয়া। তাই নেতৃত্ব যেমন আমানত; নেতৃত্ব প্রদানকারী ভোটও তেমনি আমানত। এজন্যই ভোট প্রদানের বৈধতার পক্ষে সুরা নিসার আয়াতকে আধুনিককালের ফকিহগণ দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং অযোগ্য লোককে ভোট দেওয়া অবৈধ ঘোষণা করেছেন।

নেতা ও যোগ্যতার মাপকাঠি

ইসলামি দৃষ্টিকোণে নেতাও একজন কর্মী। নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো দীন রক্ষা করা এবং দুনিয়ার রাজনৈতিক-সামাজিক জিম্মাদারি পালন করা। ইমাম মাওয়ারদি রাহি. লেখেন :

الْإِمَامَةُ: مَوْضُوعَةٌ لِخِلَافَةِ النُّبُوَّةِ فِي حِرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا

ইমামত বা নেতৃত্ব হলো, দীন রক্ষা ও দুনিয়া পরিচালনায় নবুয়াতের প্রতিনিধিত্বের জন্য যা উদ্ভাবিত হয়েছে। [আল-আহকাম আস-সুলতানিয়াহ, ১৫]

ফলে, একজন কর্মীর যেসব যোগ্যতা অনিবার্য, একজন নেতার জন্যেও সেসব গুণে গুণান্বিত হওয়া অপরিহার্য। কুরআন কারিমে একদম স্পষ্ট ভাষায় একজন আদর্শ শ্রমিক বা কর্মীর যোগ্যতা বিবৃত হয়েছে। সায়্যিদুনা মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘শ্রমে’ সন্তুষ্ট হয়ে মাদায়েনের সেই লাজনম্র তরুণী বাবাকে বলছিলেন :

(قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الأمِينُ )
তাদের একজন বললো, হে পিতা, তাকে শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করুন। নিশ্চয়ই, শক্তিশালী ও আমানতদার ব্যক্তি শ্রমিক হিসেবে উত্তম।— (সুরা কাসাস: ২৬)

এখানে শ্রম ও নেতৃত্বের অনুকূল দুটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট: যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা।

সায়্যিদুনা ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজেকে নেতৃত্বের জন্য অর্পণ করার মুহূর্তে আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, إِنّى حَفِيظٌ عَلِيمٌ (আমি হিফাজতকারী ও জ্ঞানী)। এখানে শ্রম ও নেতৃত্বের অনুকূল দুটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট: জ্ঞান ও সংরক্ষণ।

কুরআন কারিমে অন্যত্র নেতার প্রতি আদেশ করা হয়েছে : (وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ) যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-আচার করো তখন ইনসাফের সাথে ফয়সালা করো। [সুরা নিসা, ৫৮] এই আয়াতেও স্পষ্টভাবে নেতৃত্বের জন্য ন্যায় ও ইনসাফের শর্ত করা হয়েছে।

ইমাম মাওয়ারদি রাহি. সমস্ত আয়াত ও হাদিস বিচেনায় রেখে নেতৃত্বের জন্য সাতটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন: দীনদারি, দায়িত্ব আদায়ে জরুরি জ্ঞান, দৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাভাবনা, শারীরিক সক্ষমতা, ন্যায়পরায়ণতা, সাহসিকতা, বংশগত নিরাপত্তা। — আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, (১/৫–৬)

এই সাতটি গুণ কারও মধ্যে থাকলে তার হাতে নেতৃত্বের লাগাম তুলে দেওয়া যায়। অন্যথায় অযোগ্য লোকের হাতে পড়ে খিয়ানত হওয়া এবং রব্বে কারিমের ক্রোধের মুখে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।

নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি

খিলাফতের স্বর্ণযুগে নেতৃত্ব নির্বাচনের চারটি পদ্ধতি আমরা দেখি—

১. সাহাবিদের সম্মিলিত বাইআত – নবীজীর ওফাতের পর সাকিফায়ে বনু সায়িদাহতে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর নেতৃত্বে সমস্ত সাহাবি সম্মিলিতভাবে হযরত আবু বকর রা.-এর হাতে বাইআত হন। এভাবে ইসলামের প্রথম খলিফা নির্বাচিত হয়।

২. খলিফা কর্তৃক পরবর্তী খলিফা নির্ধারণ – আবু বকর রা. মৃত্যুর পূর্বে উমন বিন খাত্তাব রা.-কে খলিফা নিযুক্ত করে যান।
৩. মনোনীত শূরা পরিষদ – অগ্নিপূজারী আবু লুলু ফাইরুযের ছুরিকাঘাতে শাহাদাত লাভের আগে সায়্যিদুনা উমর বিন খাত্তাব রা.-কে নেতৃস্থানীয় সাহাবিগণ পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করলে তিনি ছয় সদস্যের একটি শুরা (কমিটি) গঠন করে দিয়ে যান। পরবর্তীতে তাদের সিদ্ধান্ত ও আবদুর রহমান বিন আউফ রা.-এর জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে উসমান রা. খলিফা নির্বাচিত হন।
৪. সামষ্টিক শূরা ব্যবস্থা – উসমান রা.-এর ইন্তিকালের পরে যেভাবে আলি রা. খলিফা নির্বাচিত হন।

উল্লিখিত চারটি পদ্ধতির মধ্যে ‘কমন’ বিষয়টি হলো, শুরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ইসলামে শুরা-ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ং রব্বে কারিম আদেশ দিয়েছেন :

( وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ)

ইস্তিগফার করো এবং পরস্পর পরামর্শ করো। যখন দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছো তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলকারীদের (ভরসাকারীদের) ভালবাসেন।  [সুরা আলে ইমরান, ১৫৯]

ফলে, যোগ্য ব্যক্তি পাওয়া গেলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ সাপেক্ষে নেতা নির্বাচন করাই ইসলামের সুসাব্যস্ত পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ত্যাগ করে অধিকাংশের পথ বেছে নিলে বিচ্যুতিই অনিবার্য হয়ে উঠবে। থানভি রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, পৃথিবীতে কমবুদ্ধির বা নির্বোধ লোকের সংখ্যা সাধারণত বেশী হয়; বুদ্ধিমানের সংখ্যা হয় কম। যদি অধিকাংশের পথ বেছে নেওয়া হয় তাহলে নির্বোধের লোকের অনুসরণ ও নির্বোধের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। পৃথিবীজুড়ে এখন এটাই বাস্তবতা। নিকৃষ্ট ও নির্বোধ শ্রেনীর লোকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। যাদের না আছে দীনদারিতা আর না আছে আখিরাতের ভয়। এসব লোকেরা দুনিয়ার প্রাপ্তিকেই মনে করে আসল প্রাপ্তি। এভাবে তারা ভ্রষ্টতার নিমজ্জিত হয়। তাছাড়া কুরআন কারিম তো বলেছে :

﴿ وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ﴾

তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে ফেলবে, তারা তো কেবল আন্দাজ-অনুমানের অনুসরণ করে চলে, তারা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু করে না। [সুরা আনআম, ১১৬]

পোস্ট টি শেয়ার করুন

অন্যান্য সকল পোস্ট