সংসারে মিয়াঁ – বিবির টুকটাক ঝগড়াঝাটি তরকারিতে কাঁচা লঙ্কার মত; একদম না থাকলে স্বাদটা অনুভব হয় না; পানসে লাগে। আবার পরিমাণ বেশী হয়ে গেলে ঝালে গাল পোড়ে, পেট পাতলা হয় এবং ‘আহার – বিয়োগের’ সময় খানিকটা জ্বালাপোড়া কষ্ট দেয়। সাংসারিক এই অম্ল – মধুর অভিজ্ঞতা মূলত স্মৃতির ক্যানভাসকে রঙিন করে তোলে, প্রণয়ের রজ্জুকে দৃঢ় করে দেয় এবং অনুরাগের পরিমাপ করতে সাহায্য করে।
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মুহতারাম শিক্ষাসচিব মুফতি মুহাম্মাদ তৈয়ব সাহেব যিদা মাজদুহু একবার ঘরোয়া আলাপে আমাদের শুনিয়েছিলেন এক ঈর্ষণীয় সুখী দম্পতির গল্প। বলেছিলেন, বেচারী স্ত্রী প্রায়শ আফসোস করে বলতেন, ‘এই সংসারজীবনে একটাই কেবল অপূর্ণতা আমার; একটা দিনের জন্য তিনি রাগ করলেন না আমার ওপর। কত চেষ্টা করেছি গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধাতে; তিনি নিতান্ত ভদ্রজনের মত শুরুর আগে সমাধা করে ফেলেছেন সবসময়।’ মূলত বিবাহিত মাত্রই জানেন, প্রতিটি ঝগড়া, উচ্চবাচ্য, মনোমালিন্য ও দূরবাসের পর প্রেম আসে মহাসমুদ্রের তীব্র ঢেউয়ের মত সর্বপ্লাবী হয়ে; যেন সমস্ত ক্লেদ, মলিনতা ও পঙ্কিল ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করে দিলো। নতুন করে শুরু হলো আরেকটি অভিযাত্রা। নতুন করে শুরু হলো কাছের আসার গল্প। তালাকের পর মিয়াঁ – বিবির প্রেম বেড়ে যাওয়ার যে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ চিত্র সমাজে হু হু করে বাড়ছে নিয়ত; তার পেছনেও সকর্মক এই অব্যাখ্যেয় প্রতীতি।
নবীজির সংসারেও ছিল এরকম টুকটাক ঘটনা। একবার সায়্যিদাহ উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রা. সারওয়ারে কায়েনাত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছিলেন। এমন সময় আবু বকর রা. এলেন এবং ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে ঘরে প্রবেশ করেই মেয়ের ওপর রেগে গেলেন। বললেন, হে উম্মু রুমানের মেয়ে, তুমি কি রাসুলের ওপর আওয়াজ উঁচু করছো? রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুজনের মাঝে এসে আড়াল হয়ে দাঁড়ালেন। আবু বকর রা. বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। খানিক পর যখন আবার ফিরে এলেন তিনি আয়িশা রা. তখন প্রিয়তম স্বামী নবীজির সাথে হাস্যরসে লিপ্ত। আবু বকর সহাস্যমুখে বললেন, আপনাদের যুদ্ধের সময় আমি চলে এসেছিলাম, এবার শান্তির সময় অনুমতি পাবো কী? [মুসনাদে আহমাদ, হা : ১৮৮৯১]
مسند أحمد جمعية مكنز (17/ 132)
18891 – حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ حَدَّثَنِى أَبِى حَدَّثَنَا وَكِيعٌ عَنْ إِسْرَائِيلَ عَنْ أَبِى إِسْحَاقَ عَنِ الْعَيْزَارِ بْنِ حُرَيْثٍ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ جَاءَ أَبُو بَكْرٍ يَسْتَأْذِنُ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَسَمِعَ عَائِشَةَ وَهِىَ رَافِعَةٌ صَوْتَهَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – فَأَذِنَ لَهُ فَدَخَلَ فَقَالَ يَا ابْنَةَ أُمِّ رُومَانَ – وَتَنَاوَلَهَا – أَتَرْفَعِينَ صَوتَكِ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَحَالَ النَّبِىُّ – صلى الله عليه وسلم – بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا – قَالَ – فَلَمَّا خَرَجَ أَبُو بَكْرٍ جَعَلَ النَّبِىُّ – صلى الله عليه وسلم – يَقُولُ لَهَا يَتَرَضَّاهَا « أَلاَ تَرَيْنَ أَنِّى قَدْ حُلْتُ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَكِ » . قَالَ ثُمَّ جَاءَ أَبُو بَكْرٍ فَاسْتَأْذَنَ عَلَيْهِ فَوَجَدَهُ يُضَاحِكُهَا – قَالَ – فَأَذِنَ لَهُ فَدَخَلَ فَقَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَشْرِكَانِى فِى سِلْمِكُمَا كَمَا أَشْرَكْتُمَانِى فِى حَرْبِكُمَا .
ভরণপোষণ নিয়ে একবার স্ত্রীদের সাথে রাসুলের মনোমালিন্য হয়েছিল। একবার রাগ করেছিলেন মধু খাওয়া নিয়ে। এমন টুকটাক ঘটনা নবীজির সংসারজীবনেও নজরে পড়ে। নজরে পড়ে সাহাবীদের জীবনেও। ব্যাপারটা অতি স্বাভাবিক। এবং দুটি কলসি পাশাপাশি থাকলে যেমন টুকটাক সংঘর্ষ হয়; সংসারেও হয়। এই স্বাভাবিক বিষয়টা সবার সম্মুখে তুলে আনলে কি বলা হবে, সে স্বামী – স্ত্রীর বিবাদ উসকে দিচ্ছে? স্ত্রীদের জন্য স্বামীর সাথে ঝগড়া করার সুযোগ করে দিচ্ছে? শান্তির সংসারে আগুন লাগাবার পাঁয়তারা করছে? বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ও প্রতিক্রিয়ায় অনেক মানুষের আচরণ ও উচ্চারণ এই রকমের হয়। অনেকে মওকা পেয়ে হৃদয়ে সুষুপ্ত ক্রোধ আগ্নেয়গিরির ‘উন্মত্ততা’ নিয়ে উগরে দেয়। তাদের উচ্চারণে না ভদ্রতা থাকে, আর না থাকে ন্যুনতম সৌজন্য। অথচ, যারা সমাধান চায়, কল্যান চায় তাদের আচরণ হতে হয় নম্র ও হৃদ্যতাপূর্ণ।
ঝগড়াঝাটির পরিমাণ বেশী হলে অনেকরকম বিপদ হয়। ঘরে ছেলেমেয়ে থাকলে তাদের সামনে ঝগড়া অনেক সময় শিশুমানসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শ্বশুর – শাশুড়ি বা বাবা – মায়ের চাপা উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাড়াপ্রতিবেশীর ‘ফিসফাসের’ রসদ জুটে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, স্ত্রীর কাছে স্বামীর ‘ভার’ ও কর্তৃত্ব কমে যেতে থাকে। অবশ্য স্ত্রী যদি সচেতন হোন এবং সাংসারিক ঝগড়াকে সাধারণভাবে নেওয়ার ‘দীক্ষা’ ও মানসিকতা তার থাকে তবে এই ঝামেলা এড়ানো যায়। যদি আল্লাহভীরুও হন, তাহলে শত ঝগড়ার পরও তিনি ভাবেন, ‘এই মানুষটাকে আমার ‘আমির’ সাহেব বানানো হয়েছে। সে যেমন হোক, জান্নাতমুখী এই সফরে তার পূর্ণ আনুগত্য আমার রবের আদেশ।’ মোটকথা সচেতন স্ত্রী ‘অল্পবিস্তর’ ঝাঁঝালো স্বাদ হজম করে ফেলতে পারেন সহজে। সমস্যা সৃষ্টি হয় অনেক ‘অবিবেচক’ ও অশিক্ষিত কর্তার কারণে। রাগের মাথায় তারা তিনটে শব্দ উচ্চারণ করে একটানে ছিঁড়ে ফেলেন তিলেতিলে রাঙিয়ে তোলা প্রেমের ক্যানভাস। আত্মনিয়ন্ত্রনে অক্ষম এসব পুরুষ বড় বিপদজনক। অবশ্য কার কখন মতিভ্রম হয় কে জানে; সুতরাং ঝাল নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য দরকারি ব্যবস্থা মাথায় রাখতে হয়। ঝগড়াকে কখনোই ‘অতিরিক্ত’ হতে দেওয়া উচিত না। অবস্থা বেগতিক দেখলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করা বা সটকে পড়া উচিত। এবং এই কাজটা স্বামী মিয়ার গুরু দায়িত্ব।
এক আরব কবির কথা বলে শেষ করি। লাইনটা পড়েছিলাম আরবি অলংকারশাস্ত্রীয় এক গ্রন্থে। কবি লিখেছেন :
আমি তোমাদের থেকে দূরে গিয়ে ঘর তুলবো; যাতে আসতে পারি তোমাদের আরও কাছে।
অবিরাম অশ্রু ঝরাবো দুচোখে, যাতে সবটুকু জল শুকিয়ে যায় চিরতরে।
আমার মা মাঝে মাঝেই বলেন, ‘ভালবাসা কেবল কাছে টানে না; দূরেও ঠেলে দেয় প্রয়োজনে।’ কেবল কাছে টানে যে ভালবাসা তাতে খাঁদ আছে। আনন্দের সাথে যেমন বেদনা থাকে, দুখের সাথে যেমন সুখ থাকে, প্রেমের সাথে যেমন থাকে বিচ্ছেদ, সংসারেও তেমন ঝগড়াঝাটি থাকে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তিত হওয়ার বা উৎকণ্ঠিত হওয়ার কারণ নেই।